মনখারাপের দিন

৫ এপ্রিল ২০২৬

বাজার থেকে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেল। নাবিলা যাবার সময় বলেছিল– ‘দেরি করবি না ভাইয়া, তাড়াতাড়ি ফিরিস! তোর তো এক বদঅভ্যাস, বাজারে গেলে ফেরার কথা ভুলে যাস।’
মা বাড়ি না থাকলে নাবিলা ঘরের কর্ত্রী। কথাবার্তায় তখন আলাদা একটা ভাব-সাব। দু’দিন ধরে মা বাড়ি নেই। ছোটো মামার অসুখ, দেখতে গেছেন। এই ক’দিন আমাকে ভারপ্রাপ্ত কর্ত্রীর মর্জি মাফিক চলতে হবে। তিনি যা হুকুম করেন ‘তথাস্তু’ বলে তামিল করতে হবে। উচ্চ-বাচ্য করা যাবে না। অন্যথায় একে সত্তুর হয়ে মায়ের কাছে চোখের পানিসহ রিপোর্ট যাবে।
ঘড়ির কাঁটা যদিও দশটার ঘর পেরোয় নি, কিন্তু পাড়া-গাঁয়ে রাত দশটা মানে গভীর রজনী। গভীর রজনীতে কেউ সজাগ থাকে না। নাবিলা সজাগ। ঘরের কর্ত্রী বলে কথা! দরোজায় টোকা দিতেই সাড়া পাওয়া গেল।

  • কে? ভাইয়া? জমিদার বাবুর এতক্ষণে আসার সময় হলো?
  • হ্যাঁ টুনটুনি, জমিদার বাবু চলে এসেছেন। দরোজাটা খুলো!
  • এই, তোকে না আমি টুনটুনি ডাকতে নিষেধ করেছি! আমাকে কী পাইছস? কচি খুকি? যাহ, আমি দরোজা খুলব না।
  • আচ্ছা বাবা, ভুল হইছে। আর টুনটুনি ডাকব না। তুই কচি খুকি না, বুড়ি। পাক্কা আশি বছরের বুড়ি। জয়তুনের মা…
    -কী! আমি জয়তুনের মা!? আম্মু বাড়ি আসুক। এবার যদি তার ছেলের বিচার না করে…
    অবস্থা খারাপ। জয়তুনের মা খ্যাপে যাচ্ছে। জলদি আপোষে আসা দরকার, নয় দরোজা খুলবে না।
  • আচ্ছা নাবিলা দরোজাটা খুল না! শুধু শুধু ঝগড়া করছিস ক্যান??
  • হ্যাঁ, আমি শুধু শুধু ঝগড়া করছি! আমি জয়তুনের মা! জয়তুনের মা অনেক বুড়ো। দরোজা খোলার তাকত নাই তার!
  • আচ্ছা ঠিকাছে, তোরে আর জয়তুনের মা বলে ডাকব না। তবে আমাকে তুই জয়তুনের মামা বলতে পারিস। তোর মতো আমি চেতব না।
  • কী…! আমি কিন্তু দরোজা খুলব না ভাইয়া!
  • ঠিকাছে ঠিকাছে মামা বলারও দরকার নাই। দরোজাটা খুল।
    পাড়া-গাঁয়ের মানুষ সন্ধ্যা ফুরাবার পরপরই রাতের খাবার সেরে নেয়। এত রাত অবধি কেউ না-খেয়ে থাকে না। নাবিলা না-খেয়ে আছে। এই এক সমস্যা নাবিলার। আমি ছাড়া খেতে পারে না। যতই ঝগড়া হোক, খাবার টাইমে সব মিটমাট। সেই ছেলেবেলা থেকে এক প্লেটে না-খেলে যেন তার ক্ষিধে মেটে না। আমারও একা একা ভাল্লাগে না। মা বিরক্ত হয়ে মাঝে মাঝে বলেন- ‘কী আহ্লাদ দেখানো হচ্ছে দেখো! বোনকে যেন ঝুলিতে ভরে সারাজীবন রেখে দেবে। বিয়ে-শাদি দেবে না।’
    আমি তখন চোখ বড়ো বড়ো করে নাবিলার দিকে তাকাই। বিস্মিত হবার ভান করি।
    -কী রে! তুই বিয়েও বসতে চাস নাকি? তলে তলে এত…
    নাবিলা কথা শেষ হতে দেয় না। খাবার মাখানো হাত দিয়ে আমার চোখ-মুখ সব একাকার করে ছুটে পালায়। একবেলা ফুলে ফুলে কাঁদে।
    মাঝে মাঝে আদুরে গলায় বলি- ‘নাবিলা, তোকে আমি কোথাও বিয়ে দিতে দেব না। তুই সারাজীবন আমার কাছে থাকবি!’
    জয়তুনের মা তো আনন্দে আটখানা, এতদিন পর আমি তার পক্ষে কথা বলছি। কিন্তু আনন্দটা স্থায়ী হয় না। পরক্ষণেই বুঝে ফেলে আমার মতলব–‘তবে বিয়ে না দিলেও তোকে বিয়ে করাব। ঘরজামাই প্রক্রিয়া। বুঝলি! না না, ঘরজামাই বাজে শব্দ। খারাপ শোনা যায়। আমরা হোম হাজবেন্ড বলব। ভদ্র ভাষা। তোর বর হোম হাজবেন্ড হয়ে থাকবে আমাদের বাড়ি। ইচ্ছে মতো ফায়-ফরমাশ খাটানো যাবে…’
    কথা শেষ করতে পারি না, তার আগেই কিল-থাপড়-ঘুষির বর্ষণ শুরু হয়ে যায়।

২.
বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়েছি। তুমুল জ্বর। থরথর করে কাঁপি। রাতে ঘুম হয় না একফোঁটাও। নাবিলারও। জ্বর আসবার পর থেকে জোর করেও তাকে তার রুমে পাঠাতে পারি না। রাত বাড়লে আমার খাটে পায়ের কাছে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকে। একটু আহ-উহ করলেই ধড়মড় করে উঠে আসে। মাথায় হাত রাখে।
-মাথা-ব্যথা করতেছে ভাইয়া? দাঁড়া, আমি ম্যাসেজ করে দিচ্ছি।
না না করলেও শুনে না। হাই তুলতে তুলতে ঘুম ঘুম পেরেশান চেহরায় আলতো করে ম্যাসেজ করে দেয়। ছোটোবোনদেরকে বিধাতা কতটা ভালবাসা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান, আমি আন্দাজ করবার চেষ্টা করি। পারি না।

৩.
নদীর তীরে দূর্বা ঘাসের উপর বসে আছি। ঘাস নয়, যেন সবুজের গালিচা। সামনে পলক নদীর স্রোতহীন স্থির পানি। দু-একটা গাঙচিলের ইতস্তত ওড়াউড়ি। একটু দূরে নদীর ও-পাড়ে ছিটকা জাল পেতে অলসভাবে বসে আছে বারু মাঝি। মাঝে মাঝে জালে টান দেয়। টান দেবার সময় অটোমেটিক যেন তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ভাওয়ালি গান…
‘বন্ধে আমায় কথা দিছে আইব আমার বাড়ি…’
মন খারাপ থাকলে এখানে এসে বসি। ভাল হয়ে যায়। প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্যে ভাল না হয়ে পারে না। কিন্তু আজ কোনোই পরিবর্তন নেই। দূর্বা ঘাসের গালিচা, গাঙচিল, বারু-মাঝি– কিছুই যেন আমাকে আকৃষ্ট করতে পারছে না।
বিয়ের শাড়িতে নাবিলাকে বেশ মানিয়েছে। যাবার সময় নাবিলা কাঁদবে। আমি সামনে থাকলে আরো বেশি কাঁদবে। বিদায়ের এই দৃশ্যটা সহ্য করতে পারব না। বরযাত্রী আপ্যায়নের পর তাই আলগোছে বেরিয়ে এসেছিলাম বাড়ি থেকে।
বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা নামছে। পলকের তীর থেকে উঠতে মন চাচ্ছে না। নাবিলা নেই, আজ বাড়ি ফেরার কোনো তাড়াও নেই। দেরি করে গেলে এখন আর কেউ চোখ গরম করে বলবে না, ‘ভাইয়া, তুই আসলে কী, বল তো? কোথাও বেরোলে আর ফেরার নাম নেই। আমি সেই কখন থেকে ঝাল-মুড়ি বানিয়ে বসে আছি তোর জন্য!

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

হামমাদ রাগিব

হামমাদ রাগিব বর্তমান সময়ের একজন তরুণ ও প্রতিভাবান লেখক, গবেষক এবং সম্পাদক। ১৯৯৪ সালে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার মৌলভীচক গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবেই পবিত্র কুরআন হিফজ করার পর তিনি কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে। পেশাগত জীবনে তিনি লেখালেখি, সম্পাদনা ও গবেষণাকেই বেছে নিয়েছেন। তাঁর কলম মূলত ইসলামি ইতিহাস, সিরাত এবং সমকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ইতিহাসের নিরেট তথ্যকে তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও গদ্যময় ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পটু। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘প্রাচীন বাংলার দরবেশ’, ‘৩১৩: বদরযুদ্ধের ঐতিহাসিক গল্পভাষ্য’ এবং ‘গল্প বলি ফিলিস্তিনের’। মৌলিক রচনার পাশাপাশি অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর বিচরণ রয়েছে। সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তায় বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে তিনি ইমাদদুদীন অ্যাকাডেমির ফাউন্ডার পরিচালক হিসেবে আছেন।

সব লেখা দেখুন

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

লেখাটি শেয়ার করুন

০টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.