শেষ অনুরোধ

৪ জুন ২০২৬

১.
সুফিয়ার বয়স খুব বেশি নয়। বড়জোড় চব্বিশ কিংবা পঁচিশ হবে। এই বয়সের মেয়েদের হাতভরতি কাচের চুড়ি থাকবে, শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসবে। কপালের বাঁ পাশ থেকে নেমে আসা একগুচ্ছ চুল হাত দিয়ে সরিয়ে দেবে। হাতে হাত রেখে স্বামীর সঙ্গে রিকশায় করে স্বাধীন পাখির মতো ডানা ঝাপটে সারা শহর ঘুরে বেড়াবে। শখ আহ্লাদ পূরণ করার উপযুক্ত সময় এটাই। কিন্তু সুফিয়ার কপাল মন্দ, ভাগ্য খারাপ। এসবের ছিটেফোঁটাও তার কপালে জোটেনি। সে এখনো মন খারাপ হলে দক্ষিণা জানালার পাশে গিয়ে বসে। বসে বসে ভাবতে থাকে একটা ছোট্ট কিশোরীর কথা। যে ফ্রক পরে মাথার চুলে দু’পাশে দুইটা বেণি করে হেলে-দুলে খেলতে যাচ্ছে সখীদের সাথে। আহা, কী ফেলে আসা জীবন! হুট করে তছনছ হয়ে গেল সব স্বপ্ন। এখন কচুরিপানার মতো ঢেউ এর সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে জীবন, যুদ্ধ সংগ্রাম। সুফিয়া দূরের পথটির দিকে তাকিয়ে আছে আনমনে। দুপুরে তপ্ত রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটা গাছ। পাতা নেই, ফুল নেই, ফল নেই। আছে শুধু গাছটি জুড়ে হাহাকার। গাছটির মতো তাঁরও হাহাকার ঠেকে। সে ভাবতে থাকে সন্তান, সংসার জীবন সংগ্রাম নিয়ে কিন্তু এসব কিছু বারবার পেছনেই পড়ে রই। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতীত। সে তখন সপ্তম শ্রেণীতে কেবল উঠেছে। পাশের এলাকার মতিউর দিন নাই, রাত নাই, রোদ নাই, বৃষ্টি নাই, সবসময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে চৌরাস্তার মোড়ে। মতিউরের পড়াশোনা খুব একটা নেই বললে চলে। একদিন পথ আটকে দাঁড়াল। কী যেন বলতে চায় সে। বলতে আর পারে নি। তার দাদা আজমত আলী খাঁ দেখে ফেলে। দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়। সুফিয়া খালি ভাবে মানুষটা বিয়ের পরও কী ভালোটাই না ছিল, আর এখন…?! আস্তে ধীরে ধীরে কী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে দিনদিন।
তার আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। ভাবলেই ছলছল করে উঠে দু-চোখ।

ছোট্ট মেয়ে আইরিনের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেল সে। আঁচলে চোখ মুছে নিল। ঝুম বৃষ্টি হওয়ার পর মেঘে ঢাকা আকাশ যেমন একটু একটু করে স্বাভাবিক হয় সেও ঠিক একটু একটু করে হেসে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল। বলল, কী মা, কী হয়েছে?
আঙ্গুল ধরে ধরে সে নিয়ে গেল তার বড় আপুদের ঘরে। তারা বইটই বন্ধ করে দুই বোন কী যেন খেলছে। আজ আর ঘাঁটাল না সুফিয়া। কিছুই বলল না। মাথা ঘোরাতে লাগল তার। বমি বমি ভাব হচ্ছে খুব। কিন্তু বমি হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, গলায় আঁটকে আছে সব। এক্ষুনি বমি করে ভাসিয়ে দেবে ঘর কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও হল না। ঝিম মেরে বসে রইল খাটে। আজ আর তার কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করছে না।

২.
সুফিয়া পর পর তিন তিনটি কন্যাসন্তান জন্ম দিয়েছে। আমাদের সমাজব্যবস্থায় কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়াটা এখনো কোনো কোনো পুরুষের কাছে অপরাধের চেয়েও বড় কিছু। জাহেলিয়াতের চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। সুফিয়ার স্বামী মতিউর রহমান, এলাকার প্রভাবশালী মানুষ। তার অহংকার আকাশচুম্বী। বংশের প্রদীপ জ্বালানোর জন্য একটা ‘ছেলে’ তার চাই-ই চাই। তিন-তিনটা মেয়ে তার কাছে বোঝা, লোকসমাজে মুখ দেখানোর পথে তার নাকি বাধা। সে আর তার মা উঠতে বসতে সুফিয়াকে অলক্ষী বলে গালি দেয়।

​সুফিয়া আবারও অন্তঃসত্ত্বা। গ্রামের দাই-মহিলারা চুপিচুপি বলেছিল, এবার লক্ষণ ভালো মা জননী, এবার তোমার কোল আলো করে ছেলে আসবে। সুফিয়া ভয়ে ভয়ে গোপন রেখেছে কথাটা। যতদিন যাচ্ছে তার ভয় চক্র হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি ছেলে না হয় তখন কী হবে!

কিন্তু মতিউরের তর সইছিল না। তার ভেতরের হিংস্র পশুটা ততদিনে জেগে উঠেছে। ​সেদিন রাতে লোডশেডিং ছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকিরা জ্বলছিল উঠানের লেবু গাছের পাতায়। মতিউর মাতাল অবস্থায় ঘরে ঢুকল। কোনো তর্কাতর্কি নয়, কোনো ভূমিকা নয়। শুধু একটা কেরোসিনের টিন আর একটা দিয়াশলাই নিয়ে সুফিয়ার ঘরের দিকে অগ্রসর হল।

​মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন সে আর মানুষ থাকে না। অমানুষ হয়ে যায়। মতিউরও ঠিক তাই হয়ে গেল। সুফিয়া যখন আগুনের শিখায় ছটফট করছিল, তখন সে হয়তো চিৎকার করে বলতে চেয়েছিল”আমার শেষ অনুরোধটা একটু রাখো। আমারে পুড়াইয়া মাইরো না গো! আমার পেটে এবার তোমার বংশের প্রদীপ জ্বলছে…” কিন্তু সেই আর্তনাদ মতিউরের কান পর্যন্ত পৌঁছালেও তার পাথুরে মন গলল না। প্রতিবেশীরা যখন ছুটে এল, ততক্ষণে সব শেষ। সুফিয়ার ঝলসে যাওয়া দেহটা পড়ে রইল ঘরের এক কোণে, ঠিক যেন এক টুকরো কাঠকয়লা।

৩.
​পরদিন সকাল, হাসপাতালের মর্গে। ডাক্তার যখন ময়নাতদন্ত শেষ করে বেরিয়ে এলেন, চশমার কাচটা তখন অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে গেল। তিনি মতিউরের দিকে তাকিয়ে তার পায়ের নিচে একদলা থুতু ফেলে বললেন, “কী ভয়ানক কাজ করলেন মিয়া? নিজের কপালডারে নিজেই পুড়াইয়া ছাই করে ফেললেন? আপনার স্ত্রীর গর্ভে এবার যমজ সন্তান এসেছিল। দুইটাই ছেলে সন্তান!

​মতিউর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যেতে লাগল। যে ‘ছেলে’র আশায় সে তার তিন মেয়ের মাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারল, সেই ছেলেরাই মায়ের পেটে ছাই হয়ে গেল!

পুলিশ এলো। হাত কড়া পরিয়ে নিয়ে এল থানায়। ​থানার হাজতের এক কোণে বসে আছে মতিউর। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। পাগলের প্রলাপ করতে লাগল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি নামার শব্দ শোনা যাচ্ছে। থানার কাছের কদমতলার দিক থেকে একটা নিশাচর পাখি ডেকে উঠছে বারবার। মতিউর শূন্য চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। তার কানে এখন কোনো পুলিশের গালিগালাজ পৌঁছাচ্ছে না, তার কানে বাজছে তিনটি ছোট্ট মেয়ের কান্নার আওয়াজ, যারা তাদের মাকে খুঁজছে। আর তার চোখের সামনে ভাসছে দুটো ফুটফুটে ছেলে শিশুর অবয়ব, যারা কোনোদিন এই পৃথিবীতে আলো দেখবে না।

​দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে চিৎকার করে বারবার বলে উঠতে লাগল, আমি পাপী, বিরাট পাপী। আমার কোনো ক্ষমা নাই মাবুদ! আমার কোনো ক্ষমা নাই!

শিক্ষার্থী: এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

মনজুর সা’দ

সব লেখা দেখুন

লেখাটি শেয়ার করুন

৩টি মন্তব্য

  1. হ
    হুসাইন বিন মোস্তফা

    সৌদি আরব থেকে পড়লাম গল্প টা, পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম

  2. আ
    আকিবুর রহমান

    বেশ ভালো হয়েছে

    1. র
      রাবতা
      ↳ আকিবুর রহমান কে উত্তরে

      💖

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.