মধুমিয়ার দীর্ঘশ্বাস

এক অব্যক্ত ঘ্রাণ। মিষ্টি মিষ্টি কিছুটা বুনো। অঘ্রান এলেই গাঁয়ের পরিবেশে ঘ্রাণটা নাকে বাজে। সে ঘ্রাণ পাকা ধানের। স্বর্ণাভ ধানগাছে আবৃত দিগন্তজোড়া ফসলি মাঠে কৃষকদের আনাগোনা আর ব্যস্ততা দৃষ্টি কাড়ে। ধানের মুঠ কাঁধে কেউ কেউ দ্রুত হাঁটছে বাড়ির দিকে, ক্লান্ত চেহরা, অথচ কী অনাবিল আনন্দ লেপ্টে আছে সেখানে। ধান যেন নয়, সোনা কুঁড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁরা। মধুমিয়ার ধান কাটা শেষ। ওগুলো বাড়ি নিতেই সে এখন ব্যস্ত। ধানের মুঠ কাঁধে সেও যাচ্ছে বাড়ির দিকে। করিম শেখের শহুরে ছেলে নাদিম এমন সময় ডাক পাড়ে- “চাচা, ধান কেমন হলো?”
ধানের মুঠ কাঁধে মধুমিয়া থমকে দাঁড়ায়। কিছুটা পেছন ঘোরে, মলিন মুখে তার এক চিলতে হাসির আভা- “আল্লা দিছে ভাইস্তা, এবার খুব হইছে!” পরম সেই দাতার কৃতজ্ঞতায় যেন নুয়ে পড়ছে মধুমিয়ার কণ্ঠ। ফের কোনো কথার অপেক্ষা করে না সে, চলতে শুরু করে আগের মতোই, দ্রুতবেগে।
অঘ্রানের কিছুটা তাপ তাপ কিছুটা নিরুত্তাপ সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। কাটা ধানের মুঠটা উঠোনের ধান-ঢিবিতে ফেলে মধুমিয়া জিরোয় না। ক্ষেতের আলে এখনো বেশ ক’মুঠ ধান পড়ে আছে, বেলা ডুববার আগে আগেই ওগুলো বাড়ি আনতে হবে। বাংগি আর শিকা নিয়ে ফের ক্ষেতে যেতে সে উদ্যত হয়। দাওয়া থেকে দিলারার হাঁক শোনা যায় তখন- “কই গা! পান খাইয়া যাইবা না?” “বেলা পইড়া আইলো, এক খান দিলে দাও তাড়াতাড়ি!”-মধুমিয়া তাড়াহুড়ো করে। পিতলের পুরনো কালছিটে থালিতে পান নিয়ে এগোয় দিলারা। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের চেহরা। পুরনো আধ-ময়লা এক খানা শাড়ির আবডালে ছিপছিপে দেহ। মুখভরতি পান। দাঁতগুলোতে সেঁটে আছে পানের দাগ। থুক করে পিক ফেলে দিলারা-“ধান আর কয় মুইঠ রইছে?”
“রইছেতো এহনো পাচ-ছয় মুইঠ।”- থালি থেকে পান নিতে নিতে মধুমিয়া উত্তর দেয়।
“বেলা ডুইব্যা আইলো, ও গুলান বাড়ি লওয়াইবা কোন সমো?”
“নাহ, এইত্তো নিয়া আইমু।”- পান চিবোতে চিবোতে মধুমিয়া দ্রুত হাঁটে মাঠের দিকে। দিলারা পুকুরপাড় পর্যন্ত যায় স্বামীর পেছন পেছন।
“ও দিলারা! জামাই ব্যটার কাম ফুরাইলো না এহনো?”- পুকুরের পুব পাড় দিয়ে বৃদ্ধ সেকান্দর আলী লাঠিতে ভর করে আসতে আসতে বলে -“তামাক তো আমার ফুরাই আইলো, বাজারে যাইবো না আইজকা?”
“আহা বাজান! তুমি এই সইন্ধা বেলা বাইর অইলা ক্যান? খবর পাঠাইলেই তো অইতো।”- দিলারা বিরক্তিমাখা হা-পিত্যেশ ঝাড়ে- “হাপানিটা বাইড়া যাইবো না? তোমার জামাইর আইজকা মেলা কাম, বাজারে যাইবো না। আহো, ঘরে আহো।”
দু বাড়ি দক্ষিণেই দিলারার বাপের ভিটা। মধুমিয়ার ছেলেবেলা ওবাড়িতেই কেটেছে। সেকান্দর আলীর তিন-চারটে দুধের গাই দেখাশোনা, বাড়ির টুকটাক কাজ, গাইয়ের ডাক উঠলে ডেকার যোগান– সবই মধুমিয়ার হাতে হতো। সেকান্দর আলীও খুব খাতির করতেন তাকে। ছেলের মতো দেখতেন। তার দিকে চেয়ে ভুলে থাকবার চেষ্টা করতেন বছর কয়েক আগে গায়েব হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলেটির কথা। দিলারা তখন ছটপটে গ্রাম্য বালিকা। সারাদিন হৈহুল্লোড় করে মাতিয়ে রাখতো পুরো বাড়িটা। সুযোগ পেলেই খুনসুটি কাটতো মধুমিয়ার সাথে।
“ও মধু ভাই, মধু ভাই! তোমার নাকটা অমুন চ্যাপ্টা ক্যান? কার ধারে গেছিলা? আহারে, এক্কেবারে চ্যাপ্টা কইরা দিলো…!”- খিলখিল করে হাসে দিলারা। চৈত্রের গুমোটবাধা দুপুরের ভারী নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যায় তার কৈশোরিপনার উচ্ছল হাসিতে। চপল একজোড়া গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীর এ উচ্ছলতার পরিণামই আজকের মধু-দিলারার সংসার।
ধানের মুঠগুলো বাড়ি আনতে আনতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে যায়। পল্লীবাঙলার সবটুকু সবুজ ঢাকা পড়ে আঁধারের গাঢ় আস্তরণে। খানিক পর দশমীর অর্ধাঙ্গী চাঁদ আকাশে উঁকি মারে। অন্ধকার ম্রিয়মান হয়, বাশঝাঁড় আর ঘন সুপোরিবাগানের নিচে গিয়ে আশ্রয় খোঁজে। চাদের আলোয় মধুমিয়া উঠোনে মাড়াই বসায়। হালের বলদ দুটো দিয়ে মাড়াই করে কাটা ধানগাছগুলো। দাওয়ায় পানের থালি রাখা। বলদদুটোকে দাঁড় করিয়ে মাঝে মাঝে জিরোয় সে, পান খায়। একটু-আধটু গল্প করে বৌয়ের সাথে। ” আল্লার রহমতে ধান তো এবার ভালোই হইছে, কী কও দিলারা, পঞ্চাশ মন পামু না?”
“পাইয়া কী অইবো, সবগুলান না আবার অফিসার গো দিয়া দিতে অয়, কেটা জানে!”- ধানচারাগুলো উল্টে-পাল্টে দিতে দিতে হতাশা ঝাড়ে দিলারা।
“কি যে কও! সবগুলান নিবো ক্যান? পনরো মনের টাহা আনছিলাম, তেইশ মন দিবার কথা আছিলো। এক বছর বেশি খাটছে, এখন বড় জোর তিরিশ মন নিবো, এর থিক্যা বেশি তো চাইবো না?” বৌয়ের কথায় শ্লেষ ঝেড়ে একটু বিজ্ঞের মতো বলে মধুমিয়া।
গেলো বছর ফসল হয় নি জমিনে, সর্বনেশে বন্যা ধুয়ে মুছে সব বরবাদ করে গেছে। গঞ্জের এনজিও অফিস থেকে ক্ষেতের খরচা বাবদ মধুমিয়া পনেরো মন ধানের টাকা এনেছিলো সুদে। কথা ছিলো ফসল ঘরে তোলবার পর শোধ করে দেবে। কিন্তু বানের পানি সব কিছু ভাসিয়ে নেয়ায় বিপাকে পড়ে সে। এনজিও অফিসে গিয়ে কাকুতি জানায়- “বানের পানি তো সব ভাসাই নিলো স্যার! আপনাগো ওয়াদাখান রাখবার পারতাছি না।
“তাতে কী অইলো মধু ভাই! এবার নিদানে পাইছে, হেইডা তো আমরা দ্যাখতাছিই!”- এনজিও অফিসার দরাজ দিল মানুষ, ব্যানসন সিগ্রেটে একটা সুখটান মেরে তিনি মুখ থেকে ধোঁয়া ওড়ান- “এই বছর দিবার পারতাছো না, তাতে সমস্যা কী? আগামী বছর ঘরে ধান তুলে দিও। আরে মিয়া, তোমাগো মতো গরীবদের সেবার লাগিয়াই তো আমরা এহানে বসেছি!”
অফিসারে শান্ত্বনায় কৃতজ্ঞতায় গদগদ করে মধুমিয়া নিশ্চিন্ত মনে বেরিয়ে আসে এনজিও অফিস থেকে। মনে মনে সে প্রশংসার স্তুতি আওড়ায় অফিসারের।
সকালে মধুমিয়ার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেলা বেশ চড়ে যায়। রাতে মাড়াই শেষ করতে গিয়ে শুতে একটু বিলম্ব হয়েছিলো, অন্যথায় ফজরের অক্তে বিছানা ছাড়াই তার অভ্যেস। শুধু সে কেন, গ্রামীণ বাঙলার সিংহভাগ কৃষক পরিবারে এ যেন এক অঘোষিত নিয়ম। মধুমিয়া ঘুম থেকে উঠেই দেখে অফিসার সাব তার দাওয়ায় বসে পান চিবোচ্ছেন। “আরে অফিসার সাব দ্যাহি! আমি আরো ভাবছিলাম ঘুম থিক্যা উইঠা গঞ্জে যাইমু আপনাগো অফিসে।”
“না মধু ভাই, শুনলাম তোমাগো ধান কাটা শেষ, তাই চইল্যা আইলাম। সমিতি এট্টু টানাপোড়েনে আছে তো!”- গোবর মেশানো কাদা দিয়ে নতুন লেপা উঠোনে থুক করে পিক ফেলে অফিসার উত্তর দেয় মধুমিয়ার।
“হো অফিসার সাব, হেইটা কি আর কওন লাগবো! হিশাবটা বইলা যান, ধান আমিই নিয়া দিয়া আইমু!”- বেশ ফূর্তি ফূর্তি শোনায় মধুমিয়ার কণ্ঠ।
লম্বা মতোন একখান খাতা বের করে অফিসার। বুক পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে লাগায়। খাতার পৃষ্ঠাগুলো উলট-পালট করতে করতে কপালে ভাঁজ ফেলে সে।- “টাকাটা তো মধু ভাই পুরা দুই বছর খাটছে, তাই না?”
“হো স্যার।”
” এক পঞ্চাশ মন হইছে।”
“কী বলতাছেন আপনে! পনরো মন ধানের টাহা এক পঞ্চাশ মন হইয়া গেলো?”- মধুমিয়ার গলায় বিস্ময় ঝরে।
“কথাটা কিন্তু তুমি ভুইল্যা যাইতাছো মধু ভাই, টাকাগুলান পাক্কা দুই বছর খাটছে তোমার কাছে! সমিতি কি এম্নি এম্নি ফেলে রাখছিলো অই গুলান?”- অফিসার একটু বিরক্ত হয়।
“কিন্তু এতো ধান আমি দিমু কইথ্যেকে? সব মিলিয়ে ফসলই তো পাইছি মাত্র পঞ্চাশ মন!”
“সমস্যা নাই, অই পঞ্চাশ মনই নিমু আইজকা, বাকি এক মন আগামি সপ্তায় পরিশোধ কইরো।”
“সব গুলান নিয়া নিলে আমাগো যে উপাস থাকতে অইবো, স্যার!”
“তোমরা উপাস থাকবা না মরবা, হেইডা তো আমাগো দ্যাহার বিষয় না? ঋণ আনছো, পরিশোধ করবা, এহানে টালবাহানা করতাছো ক্যান?”- অফিসারের কণ্ঠে এবার চূড়ান্ত বিরক্তি। দাওয়া থেকে উঠে সে মুঠোফোন বের করে। ওপারে নির্দেশনা পাঠায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাক আসে, লোকজন আসে, উঠোনের মধ্যিখানে ত্রিপলে ঢাকা ধানের উঁচু ঢিবিটা অদৃশ্য হয়ে যায়। মধুমিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কেবল। বুক ফুঁড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তার। সে দীর্ঘশ্বাস অনূদিত হয় চোখের জলে।
(এটা লেখকের দু’হাজার চৌদ্দ সালের গল্প)




০টি মন্তব্য