ঝাঁকছুট পাখি কিংবা একজন আমি

৫ এপ্রিল ২০২৬

হসপিটাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাড়ি ফেরার বেশ কয়েকদিন হলো। এ-কয়দিনে অপারেশনের ক্ষতটাও শুকিয়ে গেছে। পুরোপুরি সুস্থ আমি। আগের চেয়ে এখন অনেকটাই হালকা মনে হয় নিজেকে। আগে দুই পা নিয়ে চলতে হতো, এখন এক পা দিয়েই কাজ সারি। এক পা নিয়ে এই তো বেশ আছি। কী দরকার আরেকটা পায়ের!
এক পেয়ে প্রাণী। বিশেষণটা চমৎকার। এই প্রজাতির প্রাণী পৃথিবীতে খুবই অল্প। ভেতরে ভেতরে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হয়। সবাই যেমন, আমি সবার মতো না। আমি আলাদা। আমি এক পেয়ে প্রাণী। আমি ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম ব্যাপারটাতে আলাদা একটা সুখ আছে। এই সুখ সবার কপালে জুটে না।


কিন্তু চারপাশের মানুষের সঙ্গে যখন মিশতে যাই, আমার গর্ববোধটা, আমার ব্যতিক্রমী সুখটা কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে আসে। বাইরে বেরোলে সবাই কেমন অনুকম্পার চোখে দেখে। বাইরের কথা বলি কেন, ঘরের লোকেরাও কি কম করুণা করে? পরম করুণাময়ের কাছ থেকে আমার জন্য করুণার আলাদা একটা কন্ট্রাক্টই যেন নিয়ে রেখেছে সবাই। নাবিলা এখন আর আগের মতো মুখ ভ্যাংচায় না। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করলে গেলাশ ভর্তি পানি এনে ভিজিয়ে দেয় না আমার শিথান। তাকে বিয়ে দেবার ব্যাপারে কিছু বললে ঢুম করে পিঠে একটা কিল বসিয়ে দৌড়ে পালায় না আর। এখন আমার পাশে এলেই তার চোখে বাদল নামে। বর্ষার আকাশের মতো কপোল বেয়ে ঝরে করুণার বারিধারা। আমার বোনটি, আহা করুণাবতী বোনটি!

২.
বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেলে ওরা কেমন নিশ্চল বসে থাকে। আগের মতো প্রাণখোলা কোনো বাতচিত নেই কারো মুখে। করুণা করুণা চোখ নিয়ে ড্যাব ড্যাব করে সবাই তাকিয়ে দেখে আমাকে। যেন অ্যালিয়েন হয়ে এসেছি তাদের কাছে।
ক্রিকেটে পেইজ বলার হিশেবে পাড়ায় বেশ নাম-ডাক ছিলো আমার। বিকেলে খেলতে গেলে কার দলে নেবে, এ নিয়ে প্রতিদিনই মোটামুটি ঝগড়া বাঁধতো। সেই ঝগড়া এখন আর বাঁধে না। বিকেলে পাড়ার মাঠের এক কোণে এখন আমি ক্র্যাচে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখি। ব্যাটসম্যানরা মাঝে মাঝেই ছক্কা হাঁকায়। বল আকাশের দিকে উড়তে উড়তে মাঠের বাইরে গিয়ে ধপাস করে পড়ে যায়। আমি বলের দিকে তাকাতে গিয়ে আকাশ দেখে ফেলি। আকাশে একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে কিচিরমিচির করে। ঝাঁক থেকে একটা পাখি পেছনে পড়ে গেছে। বেশ পেছনে। ঝাঁকের পাখিগুলোর কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই সেদিকে। তারা সামনে এগোচ্ছে। ঝাঁকছুট পাখিটা পেছনে পেছনেই উড়ে যাচ্ছে নিজের মতো করে। কী তাকদির পাখিটার! ব্যতিক্রম হবার পরও, আর সবার চেয়ে আলাদা হবার পরও কারো করুণার আঘাত তাকে সইতে হচ্ছে না। করুণা যতো, সব আমার চারপাশের দুপেয়ে মানুষগুলোর ভেতরই যেন মওজুদ। অই ঝাঁকছুট পাখিটার প্রতি কেন যেন আমার ঈর্ষা জাগে। কতো সুখ পাখিটার! আহা, ব্যতিক্রমী সুখ!

৩১ মার্চ, ০১:৫০ এএম ২০১৭

উৎসর্গ : তারেক আজিজ।
এক পা নিয়ে চলতে যে ব্যতিক্রমী একটা সুখ আছে, তুই কি জানিস দোস্ত?

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

হামমাদ রাগিব

হামমাদ রাগিব বর্তমান সময়ের একজন তরুণ ও প্রতিভাবান লেখক, গবেষক এবং সম্পাদক। ১৯৯৪ সালে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার মৌলভীচক গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবেই পবিত্র কুরআন হিফজ করার পর তিনি কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে। পেশাগত জীবনে তিনি লেখালেখি, সম্পাদনা ও গবেষণাকেই বেছে নিয়েছেন। তাঁর কলম মূলত ইসলামি ইতিহাস, সিরাত এবং সমকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ইতিহাসের নিরেট তথ্যকে তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও গদ্যময় ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পটু। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘প্রাচীন বাংলার দরবেশ’, ‘৩১৩: বদরযুদ্ধের ঐতিহাসিক গল্পভাষ্য’ এবং ‘গল্প বলি ফিলিস্তিনের’। মৌলিক রচনার পাশাপাশি অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর বিচরণ রয়েছে। সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তায় বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে তিনি ইমাদদুদীন অ্যাকাডেমির ফাউন্ডার পরিচালক হিসেবে আছেন।

সব লেখা দেখুন

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

লেখাটি শেয়ার করুন

২টি মন্তব্য

  1. I
    Idris Rashed

    সুন্দর গল্প!

    1. র
      রাবতা
      ↳ Idris Rashed কে উত্তরে

      ধন্যবাদ স্যার

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.