একলা থাকার অভ্যাস

মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে পূর্বদিকে একটু হেঁটে বাজারের গলিপথ ধরে সামান্য এগোলেই হাতের বায়ে চোখে পড়বে ছোট্ট একটি মাঠ।দেখতে ছোট হলেও মাঠটির গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। কারণ আশেপাশে আর কোথাও একটি মাঠ নেই।আমরা কিছু খেলাপাগল মানুষ— দুপুরে খেয়ে বিকালে খেলাধুলা না করলে যাদের পেটে ভাত হজম হতে গড়িমসি করে।তাদের কাছে ছোট্ট একটি মাঠের গুরুত্বও অপরিসীম হবে একথা বলাই বাহুল্য।
গতমাসেও অন্য একটি মাঠে নিয়মিত খেলতাম আমরা। আজ সেখানে বসবাসযোগ্য বাসভবন নির্মাণের কাজ চলমান।
গত পাঁচটি বছরে আমাদের এমন কত মাঠ যে বাসভবন নামক রাক্ষস গিলে খেয়েছে তার হিসেব মেলা ভার।কংক্রিটের এ শহরে খেলার মাঠের অস্তিত্ব ডায়নোসরদের মতোন বিলুপ্তির পথে। প্রতিটি কদমে কদমে শিরদাঁড়া টান করে দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন।
নতুন পেলে মানুষ পুরনো ভুলে যায় এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে আমাদের নব আবিষ্কৃত মাঠের কথায় আসি। অবশ্য গল্প আমার মাঠ নিয়ে নয়, মাঠের পাশে বসবাস করা তেরো-চৌদ্দ বছরের এক ছেলেকে নিয়ে।
ওই তো, মাঠের উত্তরে সাদামাটা চারতলা যে ভবনটি দেখতে পাচ্ছেন, পান্ডারা সপরিপারে থাকে সেখানে। না না, আপনাদের চোখ যেরকম পান্ডা দেখে অভ্যস্ত এই পান্ডা সেই পান্ডা নয়।ও আমাদেরই ছোটভাই, খেলার সঙ্গী আমাদের।
নাদুসনুদুস তবে রোদে পুড়ে, ঝলসে গিয়ে,চেহারা কয়লার মতো কালো হয়ে যাওয়ায় আদর করে তাকে পান্ডা বলে ডাকি আমরা। ওর আসল নামটা… যা শালা, পান্ডা ডাকতে ডাকতে দেখি আসল নামটাই ভুলে বসেছি।
ব্যাট স্ট্যাম্প হাতে লম্ফঝম্প করতে করতে এগিয়ে আসছে পান্ডা।ওর পাশে কি শরীর স্বাস্থ্যে কি গায়ের রঙে—দেখতে ওর থেকে সম্পূর্ণ উল্টো যে ছেলেটিকে দেখছেন,তার নাম ইমতিয়াজ।পান্ডার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
মাগরিবের আজানের সময় হয়ে গেছে প্রায়। আজকের মতো খেলাধুলার সমাপ্তি টানতে হবে এখনই।পান্ডাকে ডেকে ওর হাতে ব্যাট স্ট্যাম্প বুঝিয়ে দিলো নাহিদ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার।আমরা বাড়িতে চলে যাবো। একথা জানিয়ে দিয়ে আমাদের অনুপস্থিতিতে এলাকার ছেলেপেলেদের সাথে যেনো খেলতে না বেরোয় সে ব্যাপারেও সতর্ক করে দিলো।পান্ডাকে বিদায় দিয়ে মাদ্রাসার দিকে পা বাড়ালাম।
তখনো জানতাম না— পান্ডা ও ইমতিয়াজকে শেষবারের মতো দেখা হয়ে গেছে আমাদের।
জুম’আ শেষে বিছানায় গড়াগড়ি খেতেখেতে কিছুক্ষণ ফেবুতে ঘুরাঘুরি করাটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এখন। সেই লক্ষ্যে ফোন হাতে নিতেই দেখি হুসাইন ম্যাসেজ করেছে কয়েকটা।হঠাৎ কী মনে করে ভাবতে ভাবতে ঢুকলাম ওর আইডিতে। টেক্সটা দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ।
হুসাইন লিখেছে, “ওই ব্যাটা খবর হুনছছ? আজকা দুপুরে জুম’আর সময় জল্লারপার লেকে ডুইবা চাইর পাঁচটা পোলা মইরা গেছে। হের ভিত্তে আমাগো পান্ডা একজন।”
হুসাইনের কাজকর্ম বরাবরই সন্দেহজনক ছিলো। এর আগেও একবার আমাদের এক সহপাঠীর মৃত্যু সংবাদ চাউর করে দিয়েছিলো। শুনেছিলাম একজন নাকি জানাযা পড়তে পর্যন্ত গিয়েছিলো। শিউর হওয়ার জন্য নাহিদ কে কল করলাম।
কল ধরতেই জিজ্ঞেস করলাম, “মামা, পান্ডায় বেলে মইরা গেছেগা?”
ফোনের ওপাশ থেকে ধরা গলায় নাহিদ বললো, “হরে মামা,পাঁচজন মরছে। আমাগো পান্ডায় আর ইমতিয়াজেও আছিলো লগে।আমরা এহন পান্ডার বাইত অই আছি,জানাযা বোধয় রাইত ৮ বাজে হইবো।আগে আগে আইয়া পরিছ।”
উড়ন্ত চিলের ডানা থেকে ঝরে পড়া পালকের মতো মনে হলো নিজেকে;এই জীবন কে।
গতপরশু! একসাথে খেললাম সকলে। মাঝে মাত্র একটা দিন কাটলো।একদিনের ব্যবধানে জলজ্যান্ত দুইটা ছেলে বাড়ির উঠোন লোকে লোকারণ্য করে দিয়ে নিভৃতে যাত্রা করলো অনন্তকালের দিকে।
যানজট উৎরে মাদ্রাসায় পৌঁছেছি যখন,ততক্ষণে জানাযার নামাজ শেষ হয়ে গেছে।
মসজিদের গেইট দিয়ে দুইটি খাটিয়া নিয়ে বের হচ্ছে কিছু মানুষ। গেইটের বাহিরে উচ্চস্বরে বিলাপ করে যাচ্ছেন এক মহিলা। ভদ্রমহিলা যে পান্ডার মা সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। শুনেছি, প্রথম ছেলেটাও নাকি পানিতে ডুবেই মারা গিয়েছিলো তার।
পান্ডার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।ভাবছি চঞ্চল একটি প্রাণ ঝড়ো হাওয়ায় কুপির আলো নিভে যাওয়ার মতো করে ধপ করে নিভে গেলো। চিরচেনা ঘর ছেড়ে, মায়ের নরম কোল ছেড়ে,আশ্রয় নিলো নিবিড় অন্ধকার এক গহ্বরে।অথচ ওর মায়ের সাথে দেখা হলেই ভদ্রমহিলা বলতেন,” আমার ছেলেটা বাবা আমারে ছাড়া একমুহুর্তও থাকতে পারে না।ওরে রাইখা কোনো জাগায় যাইতেই পারি না বাবা। ওরে নিয়া কী যে করি!
পান্ডা কি তবে ওর মায়ের “আমারে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকতে পারে না” একথায় অভিমান করলো! একলা থাকার অভ্যাস ওর হয়ে গেছে একথা মা’কে জানানোর মাধ্যম খুঁজতে গিয়ে সবচে করুণ,নির্মম মাধ্যমটিই বুঝি খুঁজে পেলো। এখন হয়তো নির্জন কবরের অন্ধকার গহ্বরে শুয়ে শুয়ে,অট্টহাসি দিতে দিতে মা’কে উদ্দেশ্য করে বলছে— একলা থাকার অভ্যাস আমারতো হয়ে যাবে মা। তুমি পারবে তো? আমাকে ছাড়া, একলা ঘরে থাকতে?


৬টি মন্তব্য
গল্প টা শেষ হওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো, লেখক খুবই চমৎকারভাবে গল্পটি উপস্থাপন করেছেন। দারুণ লাগলো।
ধন্যবাদ
চোখের কোণে রক্তস্নাত। আপনজন হারানোর বেদনা সহ্য করার মতো না, আর সেটা যদি হয় ছাত্রজীবনে।
সত্যিই 😥
খুবি চমৎকার ভাবে প্রকাশ পেয়েছে কথা গুলো,
ধন্যবাদ