দুখু মিয়ার কথা—আমারে দেব না ভুলিতে

অজপারা গাঁয়ের এক সাধারন মৌলভির দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্মগ্রহন করে এক শিশু । এর আগে জাহেদা আরও চারটি সন্তানের জন্ম দিলেও তাদের কেউই বাঁচেনি । ফকির আহমদ এবারও শঙ্কিত, সন্তানের নাম রাখলেন- তারাক্ষ্যাপা । বড়ই অদ্ভত নাম, তাঁর ধারনা নামে নামে যমে টানে । তাই এই অদ্ভুত কান্ড । কিন্তু মা আদর করে তারাক্ষ্যাপাকে ডাকে, নজর আলী । বাবা ফকির আহমদ এই নাম শুনলেই ক্ষেপে যায়, কিন্তু মায়ের মন কোনোভাবেই মানে না ফুটফুটে সুন্দর এই শিশুকে তারাক্ষ্যাপা বলে ডাকতে । নামের এই গোলযোগেই বেড়ে উঠতে থাকে তারাক্ষ্যাপা ওরফে নজর আলী । এরই মাঝে যাত্রাপালার দলের সাথে বেশ ভাব হয়ে গেলো নজর আলীর, দিনে মসজিদে আজান দেয় আর রাতে যাত্রার দলের সাথে গান করে বেড়ায় । বেশ ভালোই কাটছিলো জীবন । কিন্তু নয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে হতবল হয়ে যায় নজর আলী, সেই থেকে নজর হয়ে যায় দুখু মিয়া । বাবা হারা ছেলের জন্য নামটি বেশ উপযুক্তও বটে ।
শুরু হয় দুখু মিয়ার ভবঘুরে জীবন, চাঞ্চল্য স্বভাবের দুখু কোথাও স্থির হতে পারে না । আজ এখানে তো কাল ওখানে । কেনো এই ছোটাছুটি তাঁর জবাব সে নিজেও জানে না । এক বিকেলে সৈনিক দল দেখে মনে হলো তাকেও সৈনিক হতে হবে, যেই ভাবা সেই কাজ । নজর আলী হুট করেই হয়ে গেলেন পুরোদস্তুর হাবিলদার, নামও বদলে ফেললেন নিজেই । হয়ে গেলেন হাবিলদার নজরুল ইসলাম ।
হাবিলদার নজরুল কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক লেখালেখি চালিয়ে গেলেন, কখন যে তাঁর ভেতর লেখক সত্ত্বার আত্মপ্রকাশ ঘটলো¬ নিজেও হয়তো খেয়াল করেনি । নজরুল এখন কবি, কলকাতা শহরে মুসলমানরা তাকে রীতিমতো মুসলমানদের রবিন্দ্রনাথ আখ্যা দিয়ে বসলো । দুখু মিয়া এখন কবি নজরুল ইসলাম হয়ে গেলেও সেই চাঞ্চল্য এখনও তাঁর মাঝে বিদ্যমান । হুটকরেই তাঁর মনে হলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাকে কলম ধরতে হবে, হুট করে একরাতে গজগজ করে লিখে ফেললেন বিদ্রোহী । বিজলী পত্রিকায় সেই কবিতা প্রকাশ হলে রেকর্ড সংখ্যক কপি হয় বিজলী`র । নজরুল রাতারাতি কবি থেকে বনে যান বিদ্রোহী কবি । ফলাফল¬ কারাবন্দী হতে হয় তাকে । সেখানে গিয়েও কান্ড করে বসেন নজরুল, অনশনের ঘোষনা দেন তিনি । কোনো ক্রমেই অনশন ভাঙানো যাচ্ছে না নজরুলের, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখেন তাকে । কিন্তু বিদ্রোহী কবি কি কারো কথা শোনার পাত্র! নিজের মায়ের কথায়ও অনশন ভাঙেন না তিনি । বরং উলটো আরও হুমকি দিয়েন বসেন । জেলে বসেই জানতে পারেন রবী ঠাকুর তাঁর `বসন্ত` উতসর্গ করেছেন তাকে । জেলখানায় বসে এই খবরে টপটপ করে জল গড়িয়ে পরলো বিদ্রোহী কবির চোখ বেয়ে ।
বাউন্ডুলে নজরুল আকবর সাহেবের লোলুপ ফাঁদে পা দিয়ে চলে যায় কুমিল্লা, সেখানে নার্গিস তাঁর মনে প্রেমের হাওয়া দিয়ে যায় । নজরুল স্থির করে বিয়ে করবে তাকে, যেই ভাবা সেই কাজ । কিন্তু এত স্বাভাবিকভাবে কি আর বিয়ে হবে তাঁর! বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে যায় নজরুল । আবার ফিরে আসে কলকাতাতে, সবকিছু আরেকবার শুরু করে নতুন করে । কিন্তু কুমিল্লার বিরজা সুন্দরীর বাড়িতে দেখে আসা আশালতাকে কোনোভাবেই মন থেকে মুছতে পারে না সে, এবার সে সত্যিই বিয়ে করতে চায় আশালতাকে । কিন্তু হিন্দু মেয়েকে মুসলমান নজরুল কিভাবে বিয়ে করবে! হৈ চৈ পরে যায় কলকাতায়, এই প্রথম কোনো একটি বিষয়ে ভারতের হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে যায় । বিভিন্ন অশুভ আশঙ্কায় নজরুল লুকিয়ে বিয়ে করে আশালতাকে, বিয়ের পর তাঁর কল্যাণে আশালতা হয়ে যায় প্রমিলা । সাংসারিক জীবনে এসেও নজরুল তাঁর বাউন্ডুলে স্বভাব থেকে বেরোতে পারলেন না, হুটহাট করে গায়েব হয়ে যান । ঘরে বৃদ্ধা বউ প্রমিলা দেবী, সন্তান বুলবুল আর বৃদ্ধা শাশুরি গিরিবালা দেবী যে কিভাবে বেঁচে আছে সেসব একেবারে ভুলেই যান তিনি । হুট করে একবার ঢাকায় এসে নজরুলের মনে ধরে ফজিলাতুন্নেসা `ফজি` কে । এখন নজরুলের কাছে পুরো জগত-সংসার একপাশে আর ফজি একপাশে । কোনো ভাবেই নিজেকে বেঁধে রাখতে পারে না, রাত দুইটায় হুট করে এসে হাজির হয় ফজির দরজায়¬ কিন্তু তারপর?
এরই মাঝে কতকিছু ঘটে যায় জগতে, রবী ঠাকুর তাঁর জগত যাত্রার ইতি টানেন । ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায় তবে যাবার সময় দেশটাকে ভাগ করে হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান নামে দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্র করে রেখে যায় । কিছুদিন বাদে আবার পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে স্বাধীনতার লড়াই হয়, অসহায় বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে পাক বাহিনী । বাঙালী সমস্বরে গেয়ে উঠে `কারা ঐ লৌহ কপাট`, বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুলের `বিদ্রোহী` কবিতা সবার মনে সাহসের সঞ্চার করে । কিন্তু নজরুল তখন এসবের ঊর্ধে, সেই বাউন্ডুলে স্বভাব আর এখন নেই । ঠিকমতো কিছু বলতে পারেন না, লিখতেও পারেন না । নজরুল এখন শিশু হয়ে গেছেন । নজরুলের জন্মভূমি স্বাধীন হয় কিন্তু নজরুল আদৌ কি সেসব বুঝতে পেরেছিলেন? নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করা হয়, নজরুলকে নিয়ে বাঙালী জাতীর সে কি উন্মাদনা! কিন্তু সেসব কি দেখতে পেরেছিলেন নজরুল, অথবা উপলব্ধি করে পেরেছিলেন সেই আনন্দ! কি হয়েছিলো দুখু মিয়ার শেষ জীবনে? সবটা জানতে পড়তে হবে আশীফ এন্তাজ ররির `আমারে দেব না ভুলিতে`।
কিছু এলোমেলো কথা- আমি মূলত কখনো কোনো বই নিয়েই এত লম্বা-চওড়া লেখা লিখি নাই । কিন্তু কেনো যেনো আমি `আমারে দেব না ভু্লিতে` নিয়ে দারুণ মুগ্ধ । আমার কাছে পুরো বইটা অনেকটা সিনেমার মতন লেগেছে । যেখানে একটু পর পর টুইস্টে ভরপুর । বইয়ের মাঝখানে হুট করে জসিমউদ্দিন কে দেখে দারুণ অবাক হয়েছি, আসলে কবি নজরুল সম্বন্ধে আমার পড়াশোনা প্রায় শূণ্য । তাই তাঁর সাথে সমকালীন আর কোন কোন কবি/সাহিত্যিকদের আলাপ হয়েছে এ নিয়ে আমার কোনো ধারনা ছিলো না । পল্লিকবির দেয়া খাতাতে `এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে` পড়ার সত্যিই শরীরে কাটা দিয়ে উঠেছে । লাইন দু`টো আগেও পড়েছিলাম তবে এগুলো তাঁর লেখা জানা ছিলো না । দাশগুপ্ত থেকে জীবনানন্দের দাশ হয়ে যাওয়া অথবা গরু হত্যা রোধে ভারত ঘুরে বেড়ানো বঙ্কিমের দিনশেষে মোমের আলোয় বসে পথের পাঁচালি লেখা আপনাকে সত্যিই অবাক করবে । হুটহাট করে বড় বড় নামগুলো আপনার সামনে এসে ছোট ছোট তবে গুরুত্বপূর্ন ক্যামিও দিয়ে চলে যাবে । যার রেশ থেকে যাবে অনেক্ষন । আমার ভালো লেগেছে গল্পের ছলে হলেও লেখক অযথা কোনো ক্যারেক্টার আমাদের সামনে উপস্থিত করেননি, হরিদাস পাল বারবার কেনো সামনে আসছে সেটা ভাবছিলাম । কিন্তু হিন্দু-মুসলিম দাঙার বিষয়টা সামনে আসার পর মনে হলো কেনো হরিদাস পালকে লেখক সেই শুরু থেকে টেনে টেনে এই পর্যন্ত এনেছেন । ওয়েন গিলসনের `মিডনাইট ইন প্যারিস`এর কথা বারবার মনে হয়েছে এটা পড়ার সময়, হুট করেই সাদা আলখেল্লা পরে সামনে চলে আসছেন স্বয়ং রবী ঠাকুর, দেবদাসের লাল পানি গিলছেন শরতচন্দ্র । ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে গল্পের আদলে লেখা উপন্যাস এর আগেও পড়া হয়েছে, তবে আশীফ এন্তাজ রবির মতো কেউই আমাকে মুগ্ধ করতে পারেনি । আমাকে দেব না ভুলিতে আমি আবার পড়বো, তারাক্ষ্যাপার জীবনে হারিয়ে যাবো অথবা রবীর মতো বিজয়ার সাথে দাঁড়িয়ে নদী দেখবো । জসিম উদ্দিনের শিশু কবি থেকে পল্লী কবি হয়ে উঠা দেখবো অথবা ট্রামে বসে জীবনানন্দকে রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াতে বলবো ।
পরিশেষে বলবো, বইপ্রেমিকদের জন্য আমারে দেব না ভুলিতে একটি অতি সুপাঠ্য বই ।




৩টি মন্তব্য
দারুণ রিভিউ।
নজরুলের বৈচিত্র্য মুগ্ধ করল আমায়
❤