স্বত্ব

নিভু নিভু প্রদীপের মতো জ্বলছে শেষ বিকেলের সূর্যটা, হাতে একেবারেই সময় নেই তাদের। বিকেলের হেলে পড়া রোদ জানালার ফাঁক গলে ছোট টেবিলটায় পড়ছে। অনেক পুরনো টেবিল। কবে কেনা হয়েছিল, সে কথা মনে করতে হয়তো মিনিট খানেক সময় লাগবে। টেবিলের উপরে এখানে-সেখানে রঙের ছাপ। গভীরভাবে তাকালে মনে হতে পারে কিছু অবহেলার আলপনা। টেবিল গুছানো নিয়ে এ ঘরের বাসিন্দাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। একপাশে একটা ক্যাপবিহীন কলম রাখা, সেটাও কবে যে কেনা হয়েছিল কিংবা আদৌ কেনা হয়েছিল কিনা, বলাটা মুশকিল। অবশ্য কলমের চাইতে রঙতুলিই তাদের বেশি প্রয়োজনীয় আপাতত। ঘরের ভেতর খুঁজলে হয়তো গোটা কয়েক রঙের কৌটা পাওয়া যেতে পারে। কোনোটিতে রঙ আছে, আবার কোনোটিতে নেই। খালি রঙের কৌটাগুলো পরিণত হয়েছে অ্যাশট্রে কিংবা পোকামাকড়ের বাসস্থানে।
টেবিলের একপাশে দুটি ব্রাশ রাখা। এখনো ব্রাশ দুটি রঙে তকতক করছে। ব্রাশ থেকে রঙ গলে টেবিলে পড়ে নতুন আলপনা আঁকার পাঁয়তারা করছে। রঙ বেয়ে বেয়ে টেবিলে রাখা একটা বইয়ের সামনে এসে থেমেছে। চামড়ায় বাঁধানো মাঝারি সাইজের বই। বইটা বাড়ির পাশে পেয়েছিল ম্যাক। এই একচালা ঘরের দুই সদস্যের একজন সে। কুড়িগ্রামে জন্ম হয়েছিল তার। শিক্ষার্থী হিসেবে খুব একটা মন্দ ছিল না। শহরের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধু লিমনের পাল্লায় একদিন মঞ্চনাটক দেখতে গিয়েছিল। তখন অবশ্য সে ম্যাক না, বরং মোহাম্মদ আবুল কাসেম ছিল। তবে সেদিনের মঞ্চনাটক তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এরপর মঞ্চনাটক নিয়ে রীতিমতো বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দেয়। কিছুদিনের মাথায় একটা দলেও যোগ দিয়ে ফেলে। অবশ্য এতে বন্ধু লিমনের কৃতিত্বও অনেক ছিল।
কিছুদিন পর সেই দল বাদ দিয়ে অন্য একটা নামকরা দলের সাথে যোগ দিয়ে ফেলে। বছর খানেকের মাথায় বেশ নামও কামিয়ে ফেলে ম্যাক। কিন্তু বাঁধ সাধলেন তার বাবা-মা। তারা বেশ ধর্মপরায়ণ মানুষ। ইচ্ছা ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়াবেন। ছেলের অনীহার কাছে পরাজিত হয়ে কোনোমতে মেনে নিয়েছিলেন। একমাত্র বংশের বাহক বলে কথা। কিন্তু ছেলের মঞ্চনাটকের প্রতি আগ্রহের কথা জানার পর আর সহ্য করতে পারেননি। তাই মোহাম্মদ আবদুল মতিন সাহেব ভাবলেন, ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে এসব নাটকের ভূত মাথা থেকে চলে যাবে। ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরে আসবে। মোহাম্মদ আবদুল মতিন সাহেবের ভাবনা যে একদম ভুল ছিল, তা বলতে বাধা নেই। ম্যাকের মাথায় তখন শুধু নাটকই ছিল। যেহেতু ভালো নামও করেছিল, তাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কারণে থাকা-খাওয়ারও কোনো অসুবিধা হয়নি। সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। উৎসাহিত করেছিল এসব বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে ওঠার জন্য।
কিন্তু ম্যাক একটা সময় হাঁপিয়ে ওঠে। একটা শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করে সে। কী যেন একটা নেই। অভিনয়েও অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। দলের সবাই অনেকভাবে উৎসাহিত করতে চেষ্টা করে। তবুও সেই শূন্যতা কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। কিছুদিনের মধ্যে দলের লোকেদেরও ম্যাকের প্রতি অনীহা চলে আসে। একদিন সে জন্মশহরের টান ছেড়ে পাড়ি জমায় চট্টগ্রামে, যাতে নতুন পরিবেশে অচেনা সব মানুষের মাঝে নিজের শূন্যতার কারণ খুঁজে পায়। কখনো বদ্ধ রুমে দিন পার করে দেয়। আবার কখনো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে নিজেকে খুঁজে বেড়ায়। একদিন শেষরাতে তার মনে কিছু একটা খোঁচা দিচ্ছিল বারবার। নিজস্বতা। হ্যাঁ, নিজস্বতার অভাবই তার মনের সেই শূন্যতা। অন্যের অধীনে অভিনয় করে নিজের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ফুটিয়ে তুলতে পারেনি।
অভিনয়ের মাধ্যমে কীভাবে নিজের ভাবনা তুলে আনতে পারে, তা নিয়ে আবার চিন্তায় পড়ে ম্যাক। এর মধ্যে জমানো টাকাও শেষ হয়ে যায়। ক্ষুধার তাড়নায় সে রাস্তায় অভিনয় করবে ভাবল।
নিজের খেয়ালে কতক্ষণ অভিনয় করেছিল, নিজেও বলতে পারবে না। তার শুধু এতটুকু মনে ছিল, এর আগে সে আর কখনো এত তৃপ্তি নিয়ে অভিনয় করেনি। অভিনয় শেষে দেখেছিল চারদিকে মানুষের জটলা। হাততালি আর প্রশংসায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল চারপাশ। সেদিনের মতো খাওয়া-দাওয়ার টাকা জোগাড় হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় সময়ই সে রাস্তায় অভিনয় করতে থাকে। বাজারের সবার কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে অল্প দিনেই। এর মধ্যেও বার কয়েক কয়েকটি যাত্রাদল থেকে প্রস্তাব আসে।
একদিন জাকিরের সাথে কথা হয় তার। দেখে তার বয়সীই মনে হয়। লম্বা, হাড়জিরজিরে দেহ, রোদে পোড়া শরীর, ধুলোয় মাখানো কাপড় আর ঝাঁকড়া চুলে বেশ মানিয়ে যায়। ম্যাক এখানে আসার পর জাকিরের সাথে বারকয়েক দেখা হলেও কথা হয়ে উঠেনি। এমনকি অভিনয়ের ফাঁকে জটলার মধ্যেও বার কয়েক দেখেছিল মনে হয়। জাকিরের সাথে কথা বলতে বলতে জানতে পারল, তারও যাত্রাপালায় অভিনয়ের আগ্রহের কথা।
কিছুদিনের মধ্যে ম্যাক এবং জাকিরের মধ্যে ভালো একটা বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। জাকির প্রত্যেক দিনই কাজ শেষে ম্যাকের সাথে আড্ডা দিতে চলে আসত। ততদিনে জাকিরের সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হয়ে গিয়েছিল ম্যাকের। বুঝ হওয়ার পর থেকেই জানে না তার বাবা-মা কে। সবাই বলে, তার মা স্টেশনে তাকে রেখে রেলগাড়ির নিচে আত্মহত্যা করেছিল। তার মা নাকি ছোট একটা যাত্রার দলে কাজ করত আর বেশ্যাগিরি করত। এজন্য তাকে সবাই বেশ্যার ছেলে বলে ডাকতে শুরু করে। কিন্তু এতে জাকিরের মনে কখনো ক্ষোভ জন্মাতে দেখা যায়নি। সে এই স্টেশনকেই মা বলে বড় হতে থাকে। একদিন ফকির মিয়ার কেন যেন তাকে দেখে মায়া জন্মায়। ফকির মিয়া স্টেশনে গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষা করত। সে জাকিরের দেখাশোনা করতে শুরু করেছিল। এতে জাকিরেরও কোনো আপত্তি ছিল না। ফকির মিয়ার গলায় মধুরতা ছিল। ফকির মিয়ার গান খুব ভালো লাগত তার। আর ফকির মিয়াও প্রায় সবসময়ই গানের মধ্যেই থাকতেন।
ফকির মিয়ার ইচ্ছা ছিল, জাকিরকে লেখাপড়া শেখাবেন। পাশাপাশি তার সাথে যেন গানটাও শিখে ফেলে, সেদিকেও লক্ষ্য ছিল তার। কিন্তু একদিন মাদক চোরাচালানের অভিযোগে পুলিশ এসে ফকির মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। শোনা যায়, বছর খানেকের মধ্যে জেলেই মারা যায় ফকির মিয়া। এরপর থেকে আবার জাকির একা হয়ে পড়ে। স্টেশনে ভিক্ষা করে, আর এর বাইরে নানান ছোট ছোট কাজ করে পেটের চাহিদা মেটাত।
জাকিরের সাথে আড্ডা দিতে ম্যাকেরও খুব ভালো লাগত। আড্ডার মাঝে আনমনে জাকির গান গেয়ে উঠত। এত হৃদয়বিদারক আর মধুর কণ্ঠ শুনে ম্যাক আরও মুগ্ধ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেও জাকিরের আরও একটি প্রতিভার কথা জানতে পারে। গান গেয়ে গেয়ে দারুণ অভিনয় করতে পারত সে।
এভাবে দিন চলে যেতে থাকে, ম্যাকও তার চিন্তাভাবনা জানায় জাকিরকে। এতে উৎসাহিত হয় জাকিরও। একদিন জাকির ম্যাকের সাথে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ম্যাকও সানন্দে তাকে দলে নিয়ে নেয়। কিছুদিন দুজনে একসাথে অভিনয় করে ভালো প্রশংসিত হয়। তারাও বুঝতে পারে, তাদের অভিনয় মনমতোই হচ্ছে। দিনের পর দিন তাদের ক্ষুধা আরও বাড়তে থাকে, নিজেদের প্রকাশের এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যায় তারা।
জাকির ও ম্যাক দর্শকদের মাঝে অভিনয় করার আগে অনেকবার রিহার্সাল করে। কিন্তু উৎসুক দর্শক আর বাচ্চাদের কারণে অনেক সময় রিহার্সালে ব্যাঘাত ঘটে। এতে তারা স্টেশন থেকে একটু দূরে নদীর পাশে একটা ঘর বানায়। এখানে মানুষের তেমন একটা আনাগোনা নেই, তার মধ্যে এই জায়গাটা নিয়ে নানান গল্প লোকমুখে ঘুরে বেড়ায়। একদিন জাকির নিজের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব জানায় ম্যাককে। এতে ম্যাকেরও খুব একটা খারাপ লাগে না। তাই তারা নিজেদের নাম পরিবর্তন করে মোহাম্মদ কাসেম থেকে ম্যাক এবং জাকির থেকে জ্যাক নাম রাখে। কিছুদিনের মধ্যে তাদের এই নতুন নাম জ্যাক-ম্যাক সবার কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠে।
জ্যাক ও ম্যাকের একচালা ঘরে তাদের রিহার্সাল ভালোভাবেই চলতে থাকে। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও ঘরে স্থান পায়। একপাশে একটা খাট রাখা, তার ওপর কয়েকটি কাপড় অবহেলায় পড়ে আছে। ঘরের পাশ ঘেঁষে দুটি ব্যাগ; জ্যাক-ম্যাকের কাপড়ের ব্যাগ হলেও তারাও আদৌ জানে না আর কী কী আছে এই ব্যাগে। ঘরের এখানে-ওখানে কাঠ পড়ে আছে। টেবিলের নিচে করাত, হাতুড়ি আর কিছু আলপিন রাখা। করাত আর হাতুড়ি জ্যাক কীভাবে যে সংগ্রহ করেছিল, মনে নেই। কিন্তু এগুলো তাদের প্রয়োজনীয়। যেমন আজকের এই রিহার্সাল এগুলো ছাড়া সম্ভব হতো না। কিছুদিন থেকে ম্যাক ক্রুশবিদ্ধ খ্রিষ্টের অভিনয় করার কথা ভাবছিল। তার ফল আজকের এই রিহার্সাল। কাঠ দিয়ে বিশাল একটা ক্রুশ বানিয়েছে তারা। ঘরের মধ্যখানে শক্ত করে গেঁড়ে রাখা হয়েছে। ক্রুশে জ্যাক বাঁধা। তার সারা শরীরে সাদা রঙ, হাতে বাঁধা অংশে লাল রঙ, যেন টকটকে লাল রক্ত। চোখ বাঁধা। সে করুণ স্বরে গান গাচ্ছে। তাকে কেন্দ্র করে ঘুরে ঘুরে ধর্মযাজকের মতো শ্লোক আওড়াচ্ছে ম্যাক। তার হাতে দুদিন আগে খুঁজে পাওয়া সেই বই। এই বইটা সেদিন রেলস্টেশন থেকে আসার সময় বাড়ির পাশে পেয়েছিল সে। কৌতূহলবশত হাতে নেয়। ছোটবেলায় অনেক বইয়ের পোকা ছিল।
এখনো হয়তো তার কাপড়ের ব্যাগে দু-একটা বই পাওয়া যেতে পারে। সেদিন বইটি হাতে নেওয়ার পর তার মনে আবার সেই ছোটবেলার স্মৃতি জেগে ওঠে। নদীর পাড়ে শুয়ে বইটি পড়ে ফেলে। বিভীষিকাময় দু’টি গল্প তাতে। পড়ার সময় কিছুটা ভয়ে গা শিউরে ওঠে ম্যাকের। তবুও পড়ে ফেলে। শেষের কয়েক পৃষ্ঠা খালি। যেন নতুন গল্পের অভাবে পৃষ্ঠাগুলো খালি পড়ে আছে। পড়া শেষে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিল ম্যাক। আজকে আবার বইটি কাজে লেগেছে।
জ্যাকের গান আর ম্যাকের শ্লোক মিলে এক অন্যরকম মাদকতা তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে ম্যাক হাতে রাখা বইটি টেবিলে রেখে একটা কাপড়ের টুকরো হাতে নেয়। জ্যাকের পেছনে এসে তার মুখ বেঁধে দেয় ম্যাক। গানের সমাপ্তি হয়। ম্যাকের শ্লোক তখনও চলছেই। লাল রঙের একটা কৌটা নিয়ে পবিত্র জলের মতো করে জ্যাকের মুখে রঙ ছুঁড়ে ম্যাক। জ্যাককে তখন বিভীষিকাময় আর ক্লান্ত ভঙ্গিতে দেখা যায়। রঙের কৌটা রেখে একপাশ থেকে ম্যাক হাতুড়ি আর করাত তুলে নেয়। দু’হাত ছড়িয়ে উন্মাদের মতো ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ জ্যাকের হাতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। জান্তব আর্তনাদ ফুটে ওঠে জ্যাকের মুখ থেকে। মুখ বাঁধা থাকায় শব্দ বেশি দূর ছড়ায় না। এরপর একের পর এক আঘাত করতে থাকে হাতুড়ি দিয়ে। একসময় করাত দিয়ে আঘাত করতে থাকে। জ্যাকের শরীরের সাদা রঙ রক্তে লাল হয়ে যেতে শুরু করে।
কিছুদিন ধরে অভিনয়ের সময় ম্যাকের নিজেরই মনে হতো, সে আর অভিনয় করছে না। চরিত্রটা যেন তাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিচ্ছে। সংলাপ মুখস্থ না থাকলেও মুখ থেকে কথা বেরিয়ে আসত। কখনো কখনো নিজের বলা কথাই শুনে চমকে উঠত সে।
জ্যাক একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, “তুই চরিত্রের মধ্যে বেশি ঢুইকা যাস।”
ম্যাকও হেসেছিল। কিন্তু কথাটা তার মাথায় থেকে গিয়েছিল।
কতটা ঢুকে গেলে মানুষ আর চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না—এই প্রশ্নটা তাকে ইদানীং প্রায়ই ভাবাত।
ম্যাক টেবিল থেকে বই আর ক্যাপবিহীন কলম হাতে নিয়ে দ্রুত লিখতে থাকে। বইয়ে তার বাবা-মা আর তার যাত্রাপালার অধিকারীর গল্পের পরে জ্যাকের গল্প স্থান পায়। লেখা শেষ করে ম্যাক নদীর দিকে বই ছুঁড়ে ফেলে দেয়।


০টি মন্তব্য