বিজয়, বিভ্রান্তি ও বিবেকের দায়: একটি অসমাপ্ত সাক্ষ্য

৩ মে ২০২৬

টানা সপ্তাখানেক প্রচণ্ড দাবদাহের পর আজকে সন্ধ্যা থেকে বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে । মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে, চারিদিকে থমথমে একটা আবহ । জানালাটা পুরোপুরি খুলে পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম আয়েশ করে, হাতে এলিজাবেথ বীচারের আঙ্কল টমস কেবিন । আমার ধারনাকে সত্যি করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো । চেয়ার নিয়ে সরে এসে টেবিলে বসলাম, কিন্তু পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না কিছুতেই । স্মৃতি থেকে এখনও রক্তের দাগগুলো মুছে ফেলতে পারিনি, পারবো বলেও মনে হয় না । প্রতিবছর জুলাই ফিরে এলেই আমার স্মৃতির জগতটা উলটপালট হয়ে যাবে আবারও । জুলাই শহীদদের জন্য কিছু না করতে পারার ব্যর্থতা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে । এক বছর আগেও ভাবতে পারিনি জেনারেশন যুমার এতো কিছু করার ক্ষমতা রাখে ।

আমি তখনও পরবাসেই, দেশ থেকে সাত হাজার মাইল দূরের এক শহরে ভাগ্যের সন্ধ্যানে ছুটে বেড়াচ্ছি— অথবা হয়তো যাপিত জীবনের কারাগারে বন্দী হয়ে আছি । সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত না থাকায় তখনও আসলে বুঝতে পারছিলাম না যে দেশে কি হতে যাচ্ছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছে শিরোনামে ইউটিউবে বেশ কিছু সংবাদ চোখে পড়েছে তবে বিস্তারিত তখনও জানিনা অথবা জানার চেষ্টাও করিনি । আন্দোলন হওয়া আর সেখানে পুলিশের লাঠিচার্জ তো আর নতুন কিছু না আমাদের দেশে । এক দশক আগের মে মাসের এক রাতে তো এরচাইতেও জঘন্য ঘটনা ঘটতে দেখেছি । তবে সেদিন হুট করে এক বন্ধুর ফোন পেয়ে হুঁশ ফিরলো, সে জিজ্ঞেস করলো দেশের খবর রাখছি কি না । উত্তরে না শুনে বেশ অবাক হলো । তার ভাষ্যমতে দেশের পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীপ্রধান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদেরকে ‘রাজাকার’ বলে সম্বোধন করেছেন । ফলে ছাত্রদের রাগ ও ঘৃণা ভয়াবহভাবে  ফুসে উঠেছে, তারা এখন সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । আস্তে আস্তে ঘটনা আরও খারাপের দিকে গেলো, সরকারী মদদে লালিত হওয়া পুলিশ বাহিনী নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষন শুরু করলো । পাছে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর ছড়াছড়ির ভয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলো সরকার । প্রায় এক সপ্তাহ নাগাদ চললো ইন্টারনেট বন্ধের সেই বিশ্রী কান্ড । সারাদিন ফোন করে যাচ্ছিলাম আব্বু-আম্মুর মোবাইলে, পুরো সপ্তাহে একবার আব্বুর সাথে একটু কথা হলো তবেও তাতেও কথা কেটে কেটে যাচ্ছিলো । জানলাম তারা ভালো আছে । ছোট ভাইটাকে বললাম সাবধানে থাকতে ।

এরপর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি, কাজে যাই, বাড়ি ফিরি— কিন্তু কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিলাম না এসবে । আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ব্যাপারটাকে বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে শুরু করেছে । ইউরোপের বেশকিছু দেশেও প্রবাসী বাঙালিরা SAVE BANGLADESHI STUDENTS ব্যানার নিয়ে ছাত্রদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছেন ।

ইতোমধ্যেই হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদরা তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে জনগনের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন । অবশ্য ততদিনে আন্দোলনও একটি সাধারন ছাত্র আন্দলোন থেকে জনগনের সরকার বিরোধী আন্দলোনের আকার ধারন করেছে । রিকশা চালক, খেটে খাওয়া দিনমজুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর থেকে শুরু করে সর্বশ্রেণীর মানুষজন এসে দাড়ালো ছাত্রদের পাশে । অপরিকে পাল্লা দিয়ে নিহতের সংখ্যাও বাড়ছে । হেলিকপ্টার থেকে চালানো গুলিতে শিশু বাচ্চা নিহত হওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটলো । তখনও মনকে আশ্বাস দিতে পারছিলাম না যে এসবকিছুর বিনিময়ে হলেও একদিন আমরা এর আশানুরূপ সমাপ্তি দেখতে পারবো । আসলে সেই ছোটবেলা থেকে এই একটা মানুষকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দেখতে দেখতে হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে তারও একদিন পতন হবে ।

হুটকরেই ফাহাম আব্দুস সালাম তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন । ভদ্রলোক বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অনেক আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বললেও এইবার একলাফে যেনো কয়েকশো ধাপ আগে চলে গেলেন । তরুনরা বেশ ভালোভাবেই তাকে গ্রহন করলো ।

বন্ধু একদিন বললো আজকে বেশকিছু জেলাশহরে মিছিলরত ছাত্রদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে আর খুব সম্ভবত তারই ফলশ্রুতিতে লং মার্চ টু ঢাকা একদিন পিছিয়ে আনা হয়েছে এবং তা আগামীকালই । প্রায় সারারাত জেগে দুইজনে আলাপ করলাম । কাল কি হতে পারে, নতুন কোনো সরকার আসলে কে হবেন তিনি— আরও নানান বিষয় । তবে আমাদের  সব আশা-ভরসা টিকেই  ছিলো ‘যদি’র উপরে । তখনও আমার মনের একটা অংশ বলছিলো রক্তের সমুদ্র পেরিয়ে হলেও ‘মহাজন’ তার  ক্ষমতা ধরে রাখবেন । অপর একটা অংশ নিভু নিভু প্রদিপের মতো আশার আলো জ্বালিয়ে রাখছিলো । পরদিন সকালে কাজ থেকে ছুটি চাইবো চাইবো করেও শেষ পর্যন্ত মন পরিবর্তন করলাম এই ভেবে যে, কিছু একটাতে ব্যস্ত থাকলে বোধহয় পেরেশানি কম লাগবে । কিন্তু না— কাজে আমি মন দিতে পারছিলাম না কোনোভাবেই । এখান সেখান থেকে উড়ো খবর পেতে লাগলাম ছাত্র নেতারা সবাই নিহত হয়েছেন, আবার কেউ বা বলছেন ক্ষমতাসীন মন্ত্রীপ্রধান সেনাপ্রধানের সাথে আলোচনায় বসেছেন । কিন্তু বিশ্বাস কাকে করবো বুঝতে পারছিলাম না । এদিকে মনের অবস্থা শোচনীয়, একে তো এতো দূরে তারউপর নির্ভরযোগ্য সংবাদ পাচ্ছি না । ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাত বৃদ্ধাঙ্গুলি থেমে গেলো, বাধ্য হলো থেমে যেতে । কয়েক মুহুর্ত বুঝতে পারলাম না কি করা উচিত, অত্যাধিক আনন্দের প্রথম কয়েক মুহুর্ত বুঝি এমনই হয় । টের পেলাম চোখ দুটো বড় হয়ে গিয়েছে । ফাহাম আব্দুস সালামের পোস্ট থেকে জানতে পারলাম ‘মহাজন’ তার গাট্টি বোস্কা নিয়ে তার বন্ধুর কাছে উড়াল দিয়েছেন । সাথে সাথে ফোন করলাম বাসায়, আব্বু-আম্মুর সাথে কথা বললাম । বন্ধুকে ফোন করলাম, দেখলাম মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায় । কারো কারো হাতে মিস্টির বাক্স, ছোট ছোট বাচ্চারা হাতে বাঁশি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে এখানে ওখানে । আনন্দ মুখর পরিবেশ চারিদিকে, অবশ্য সেই বাচ্চাগুলো তাদের আনন্দের কারন বুঝতে পেরেছিলো বলে আমার মনে হয় না, তবে উতসবের বাতাস তাদেরকেও মোহগ্রস্থ করে ফেলেছিলো । এরপরের কাহিনীও যথেষ্ট রোমাঞ্চকর! টানা কয়েকদিন দেশে কোনো আইনের প্রয়োগ না থাকা, দেশজুড়ে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়া । আর ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় লোকজনের এলাকা জুড়ে মার্সিডিজ আর জার্মান শেফার্ড নিয়ে টহল দেয়া কিংবা রাতের বেলা রাস্তার মাঝে নাইট পার্টির আয়োজন করে ফেলা— এ সবই ছিলো আন্দোলন পরবর্তী দিনগুলোর নিয়মিত সংবাদ । প্রতিদিন রাত হলেই নতুন কোনো গুজবের আগমনও এই সময়েরই অংশ । এক সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এলো, তার মন্ত্রী সভায় ছাত্রনেতারা জায়গা পেলো, আস্তে আস্তে দেশ স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করলো । এই চেষ্টা কতটা সফল আর কতটা বিফল সেটা নিয়ে দীর্ঘ তর্কের সুযোগ আছে । প্রত্যেকের চাহিদার জায়গা ভিন্ন, কেউ পিচ ঢালা সড়ক চায় তো কেউ পেটে দুবেলা ভাত চায় ঠিকমতো । সমাজের নানান স্তরের মানুষদের নানান রকমের চাহিদা আর এইসবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধার দায়িত্ব সরকারের । তাই যখন শ্রেনী ‘ক’ ভাবছে সরকার খুব ভালো কাজ করছে শ্রেনী ‘খ’ হয়তো ভাবছে আগের সরকারই ভালো ছিলো । তবে এসবকিছুর পরও যখন দেখি জুলাইয়ে নিহত কোনো শহিদের স্ত্রী না খেয়ে আছে, তখন খারাপ লাগে । যখন জানতে পারি জুলাইয়ে আহত ছেলেটা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নিজেকে খুব অপরাধী বোধ হয় । সফল হয়েও এতোটা ব্যর্থ কেনো আমাদের আন্দোলন? এসব প্রশ্নের উত্তর বোধকরি কোনো একদিন জানতে পারবো তবে ততদিনে হয়তো ছোট্ট ফাতেমা অনেক বড় হবে । জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া বাবার জন্য সে আর প্রতিদিন অপেক্ষা করে বসে থাকবে না । সে জানতে পারবে কারা তার বাবার হন্তারক । হয়তো সেদিন সে এটাও জেনে যাবে যে কাদের ব্যর্থতায় দুমুঠো ভাতের জন্য তার মা সারাটা জীবন কি অমানুষিক পরিশ্রম করে গেলো ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো সেদিন ফাতেমার বিবেক কি এই দুই শ্রেনীর মানুষকে ভিন্ন কাতারে রাখতে পারবে?

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

তামিম রায়হান

সমকালীন প্রজন্মের এক মননশীল লেখক ও চিন্তক। তাঁর জ্ঞানচর্চার সূচনা কওমি ধারায়, যেখানে তিনি শিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি অর্জন করেন। পরবর্তীতে জেনারেল শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তিনি তাঁর চিন্তার পরিসরকে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক করে তোলেন। পাঠাভ্যাস তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে করে তুলেছে এক নিবেদিত পাঠক; বলা যায়, জ্ঞানসন্ধানই তাঁর নেশা ও নিত্যসঙ্গী। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, যা তাঁর চিন্তা ও লেখায় প্রতিফলিত হয়। বর্তমানে তিনি ‘রাবতা’-এর কো-ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলছেন একজন সচেতন ও প্রজ্ঞাবান কণ্ঠ হিসেবে। তাঁর লেখায় রয়েছে চিন্তার স্বচ্ছতা, অনুসন্ধিৎসা এবং সময়কে বুঝে ওঠার এক আন্তরিক প্রয়াস।

সব লেখা দেখুন

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

লেখাটি শেয়ার করুন

০টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.