বিচ্ছেদ, মিলন ও কাহলীল জিব্রান

৩ মে ২০২৬

কাহলীল জিব্রানের বিখ্যাত গ্রন্থ “দি প্রফেট”-এ চমৎকার একটি প্রশ্ন আছে: “Shall the day of parting be the day of gathering?” — অর্থাৎ, বিচ্ছেদের দিনটাই কি আবার মিলনের দিন হতে পারে? একটু গভীরভাবে ভাবলে মনে হয়, কথাটা একেবারে অমূলক নয় । আমাদের জীবনের প্রতিটি বিচ্ছেদ যেন কোথাও না কোথাও একটি নতুন মিলনের উপলক্ষও তৈরি করে দেয় । আম্মুকে নিয়ে হাসপাতালে থাকার সময় এমন অনেক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যাদের সঙ্গে হয়তো জীবনে আর কখনও দেখা হবে না । বিচ্ছেদই যেন আমাদের এক জায়গায় একত্র করেছিল, অদৃশ্য কোনো বন্ধনে বেঁধেছিল সবাইকে ।

সেবার মসজিদের ইমামের জানাযায় মাঠে তিল ধারণের জায়গা ছিল না । দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসেছিল জানাযার নামাজে শামিল হতে । মাঠে দাঁড়িয়ে সকলেই একে অপরের সাথে গুনগুন করে ইমাম সাহেবের স্মৃতি আওড়াচ্ছিল । মক্তবের ছোট শিশুরা হয়তো পুরোটা বুঝতে পারছিল না, কিন্তু বড়দের মুখের গম্ভীরতা, দাদার চোখের ভেজা চাহনি—তাদের মনেও যেন এক অজানা দুঃখের ছোঁয়া লেগেছিল । চার তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঢাকা থেকে নামাজে অংশ নিতে আসা যাত্রীদের গাড়ি গুনেছিলাম আমি । তার আগে এত গাড়ি একসাথে কেবল টিভির পর্দাতেই দেখেছি ।

আসলে পৃথিবীতে প্রতিটি মৃত্যু শুধু শোকের ঘটনা নয়, এটি জীবিতদের এক ধরনের অপ্রত্যাশিত মিলনও বটে । তবে সেই মিলনে আনন্দ থাকে না, থাকে না কোনো তৃপ্তি—থাকে শুধু কপোলে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ আর হারানোর গভীর ব্যথা । অবশ্য সব মিলন যে আনন্দের হবে, এমন কোনো নিয়ম তো বিধাতা ঠিক করে দেননি ।

ছোটবেলায় আমাদের অঙ্কের মাস্টারমশাই একবার বিলেত গিয়েছিলেন । আমরা ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো আর ফিরবেন না। তাঁর “বিদায়”-এ আমরা কেউ কেউ আনন্দও পেয়েছিলাম—ক্লাসে বেতের শাসন থেকে মুক্তি বলে কথা । তবে কয়েক মাস পর আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে তিনি ফিরে এলেন, আগের চেয়ে আরও সুস্থ-সবল হয়ে । শরীর থেকে অদ্ভুত বিলেতি গন্ধ, পরিপাটি চুল—সব মিলিয়ে তিনি যেন একেবারেই অন্য মানুষ হয়ে উঠেছিলেন । সবাই তাঁর চারপাশে ভিড় জমাল বিলেতের গল্প শোনার আশায় । কিন্তু আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম । কারণ আমি জানতাম, এই “ফিরে আসা”-র পর থেকেই আবার সেই সপাং সপাং বেতের শব্দে ক্লাসের নীরবতা ভাঙবে । তাই সব বিচ্ছেদই দুঃখের নয়, আর সব মিলনও আনন্দের নয়—এই সত্যটি খুব ছোট বয়সেই যেন বুঝে গিয়েছিলাম ।

“দি প্রফেট” পৃথিবীর অন্যতম বহুল পঠিত বইগুলোর একটি—যা ৪০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে । ১৯২৩ সালে প্রথম প্রকাশের পর থেকে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি পাঠকদের ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে এবং মানুষের অন্তর্গত অনুভূতিগুলোকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে । এই বইতে আল-মুস্তফা নামের এক চরিত্রের কথা বলা হয়েছে, যিনি দীর্ঘ বারো বছর অপেক্ষা করছেন নিজের জন্মভূমিতে ফেরার জন্য । এই সময়ের মধ্যে তিনি ওরফেলিস নগরীর প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন, যেন শহরটির প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেও তাঁর এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে । তাই বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে গভীর এক অনুভূতি—
“Too many fragments of the spirit have I scattered in these streets.” অর্থাৎ, “এই শহরের পথে-ঘাটে আমি আমার আত্মার অসংখ্য টুকরো ছড়িয়ে দিয়েছি ।”

আমরা যারা ছোটবেলায় বোর্ডিং স্কুলে থেকেছি, তারা এই কথার অর্থ খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারি । মাসের পর মাস ছুটির অপেক্ষা, বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের টান তৈরি হয় মনে । তবে ছুটির দিন বাড়ি যাওয়ার সময়ও এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে । যেই দেয়ালের প্রতিটি ইটের সাথে আমাদের সখ্যতা ছিল, যেই ভবনের আনাচে কানাচে আমাদের স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাদেরকে ছেড়ে যাওয়ার বেদনা আর ঘরে ফেরার আনন্দ একসাথে মিশে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয় । সেই অনুভূতিকে ব্যাখ্যা করার মতো ভাষা কবিদের কাছে থাকলেও থাকতে পারে, তবে আমার কাছে নেই । যে জায়গাটিকে আমরা অস্থায়ী বলে জানি, সেখানকার দেয়াল, বাতাস, আলো—সবকিছুর সঙ্গেই অজান্তে আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে । ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারি, শুধু মানুষ নয়, জায়গাও আমাদের ভেতরে জায়গা করে নেয়, আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে । আল-মুস্তফার বিদায়ে ওরফেলিসের সকল মানুষ একত্রিত হয় একস্থানে, সকলের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে । প্রিয়জনের বিদায়ে এমন পরিস্থিতিই বুঝি তৈরি হয় । তিনি তখন আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেন ফেলে আসা প্রতিটি মুহূর্তকে । তাঁর মনে হয়, বিচ্ছেদ একজন মানুষের ফিরে যাওয়া নয়, বরং তার ভেতরে জমে থাকা স্মৃতির টুকরোগুলোরও এক অদৃশ্য বিচ্ছেদ, যা নিঃশব্দে ভেঙে যায় ভেতরে ভেতরেই ।

এই কারণেই হয়তো তাঁর মনে বারবার প্রশ্ন জাগে—
“Shall the day of parting be the day of gathering?”
বিচ্ছেদের দিনটাই কি তবে মিলনের আরেক রূপ?

রবি ঠাকুরের “তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম” খুব সূক্ষভাবে জানিয়ে দেয় যে, বিচ্ছেদ মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রিয়জন দূরে চলে গেলেও তার বসবাস হৃদয়েই থেকে যায় । কখনও কখনও বিচ্ছেদই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে, কারণ সেখানে দূরত্ব সত্ত্বেও ভালোবাসার নীরব উপস্থিতি আজীবন রয়ে যায় অন্তরে । অপরদিকে জীবনানন্দ তার ভাষায় বিচ্ছেদকে ব্যাখ্যা করেন “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে” লিখে— যেখানে বিচ্ছেদ কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়, বরং বারবার ফিরে আসার এক নীরব, অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা । সাহিত্যের জগতে বিচ্ছেদকে একেক সময় একেকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; কখনও বিচ্ছেদ নিজেই কারোর বড়সড় কবি হয়ে ওঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কখনও তা হয়ে উঠেছে গভীরতম অনুভূতির উৎস ।

তবে আল-মুস্তফার বর্ণনায় বিচ্ছেদ যেন এক ভিন্নরূপে ধরা দিয়েছে এখানে । দূর থেকে তিনি যখন দেখতে পান তাকে ফিরিয়ে নিতে আসা জাহাজটি আস্তে আস্তে নোঙ্গরের দিকে এগিয়ে আসছে, তখন গোটা ওরফেলিসের মানুষের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সেই দুঃখ অনুভব করতে পারি । আমাদেরও মনে হয়—তিনি তো আমাদেরই একজন, আমাদেরই ভাই কিংবা বন্ধু—তাহলে তিনি বিদায় নিচ্ছেন কেন? তখনই মনে পড়ে সেই প্রশ্ন— ‘Shall the day of parting be the day of gathering?’ হয়তো তাঁর এই বিদায়ই আমাদের একত্র করে, দৃশ্যমান কোনো স্থানে নয়, বরং আত্মার কোনো নীরব জগতে । হয়তো টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর হৃদয়ের অংশগুলো ততদিনে আমাদের ভেতরেও ডালপালা মেলতে শুরু করেছে— তাই তিনি কোথাও হারিয়ে যান না, শুধু ছড়িয়ে পড়েন আমাদের মাঝে, অদৃশ্য এক মেলবন্ধনে ।

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

তামিম রায়হান

সমকালীন প্রজন্মের এক মননশীল লেখক ও চিন্তক। তাঁর জ্ঞানচর্চার সূচনা কওমি ধারায়, যেখানে তিনি শিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি অর্জন করেন। পরবর্তীতে জেনারেল শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তিনি তাঁর চিন্তার পরিসরকে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক করে তোলেন। পাঠাভ্যাস তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে করে তুলেছে এক নিবেদিত পাঠক; বলা যায়, জ্ঞানসন্ধানই তাঁর নেশা ও নিত্যসঙ্গী। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, যা তাঁর চিন্তা ও লেখায় প্রতিফলিত হয়। বর্তমানে তিনি ‘রাবতা’-এর কো-ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলছেন একজন সচেতন ও প্রজ্ঞাবান কণ্ঠ হিসেবে। তাঁর লেখায় রয়েছে চিন্তার স্বচ্ছতা, অনুসন্ধিৎসা এবং সময়কে বুঝে ওঠার এক আন্তরিক প্রয়াস।

সব লেখা দেখুন

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

লেখাটি শেয়ার করুন

০টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.