সংসার-জীবন-যাপন

২৯ মে ২০২৬

একজন প্রাইভেট টিউটরের জীবন বেশ উপভোগ করছি তখন । প্রতিটা পরিবার আমার জন্য একটা শিক্ষালয় । নতুন টিউশনি নতুন চ্যালেঞ্জ । প্রতিটি পরিবারের আলাদা জীবন পদ্ধতি । আলাদা ঐতিহ্য । আলাদা ইগো । কেউ সন্তান দিয়ে নিজের জীবনের সকল ব্যর্থতা গুছাতে চান । কেউ নিজের মেধার সঙ্গে সন্তানকে তুলনা করেন । কেউ নিজের অর্থনৈতিক স্টেটাস অনুযায়ী সন্তানের থেকে ফলাফল চান ।

এইসবের ভেতরে ঢুকে একসময় হয়রান হয়ে যাই । মনে হয় এইসব লড়াই মূলত । এইগুলো জীবন না । পালিয়ে যেতে চেয়েও পারিনি । এক তীব্র প্রতিযোগিতার মেশিন জীবন যাপন করতো প্রতিটা ভালো শিক্ষার্থীর পরিবার । আবার খারাপ শিক্ষার্থীর পরিবারগুলো হীনম্মন্যতার শেষ প্রান্তে গিয়ে নির্জীব একটা জীবন যাপন করতে দেখেছি । এরমধ্যে কিছু ব্যতিক্রম অভিভাবক আমি পেয়েছি । যাদের কারণে আমার ট্যূশনি জীবন একসময় উপভোগ্য হয়ে উঠে ।

এক বাসা থেকে পড়িয়ে বের হয়েছি । সময় তখন রাত এগারোটা । পাশের বাসার এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোক আমার সাইকেল থামালেন । কিছুটা বিরক্ত হয়ে থামলাম । কথায় একটু ঝাঁঝ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন ডাকছেন’? তিনি বললেন, ‘আপনি কি সাইফ স্যার!’ তাঁর বিনয় ও ভাষায় আমি কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললাম, ‘জ্বী’ । “খুব বেশি কষ্ট না হলে আপনি একটু আমার সঙ্গে বসবেন! আপনাকে নিয়ে কথা বলতে বলতে রাতের খাবার খেতে চাই।” বললেন তিনি । কিছুটা বিব্রত ও ভয় তখন কাজ করছিল । কারণ তখন নানান জায়গা থেকে বিয়ে প্রস্তাব আসছিল । এমন সময় সেই ভদ্রলোকে ফাইভ পড়ুয়া ছেলে আমাকে বাসার জানালা দিয়ে সালাম দিল । আশ্বস্ত হলাম । কারণ কোচিংয়ে সেও আমার ছাত্র ।

খেতে খেতে তিনি অনেক আলাপ করলেন । আলাপের মধ্যে আমার মনে হলো তিনি আমার ইন্টারভ্যূ নিচ্ছেন । খুব সূক্ষ্ম কিছু ব্যাপার জানতে চাইলেন । আমি যতদূর পারলাম তার সঙ্গে কথা চালিয়ে গেলাম ।

খাবার শেষে তিনি স্ত্রীর না ধরে ডাকলেন । কথা বলতে বললেন আমার সঙ্গ । মনে হলো আমি উত্তীর্ণ হয়েছি । ধারণা হচ্ছিল ছেলেকে পড়াতে বলবেন । আমার ধারণা ভুল প্রমাণ করে ভদ্র মহিলা অদ্ভুত এক কাজ অফার করলেন । যা এর আগে আমি কখনোই করিনি । তাদের নবম শ্রেণি পড়ুয়া এক মেয়ে আছে । একটা ভালো স্কুলের ফার্স্ট গার্ল । কোন প্রাইভেট পড়তে তার হয় না । মা-ই যথেষ্ট পড়ানোর জন্য । সেই মেয়ের ‘মেন্টর’ হতে প্রস্তাব করলেন তারা । আমি একটা বোকা লুক দেওয়ার কারণে তারা সদয় হয়ে কাজটাও বুঝিয়ে দিলেন । সিদ্ধান্ত হলো সপ্তাহে দুইদিন আমি এই শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নিয়ে মাতাব্বরি ফলাবো ।

তিন মাস চলে গেল । আমার ধারণার চেয়ে বেশি পেমেন্ট করছেন পরিবারটি । কিন্তু এই তিনমাসে বাবাকে দেখিনি । জানতে পারলাম বিজনেসের কারণে তিনি প্রায়ই এমন মাস কয়েক দেশের বাইরে থাকেন । চতুর্থ মাসের মাঝামাঝি ভদ্রলোক আমাকে আবার রাতের ডিনারে ডাকলেন । সেদিন পরিবারের সবাই বসলেন এক টেবিলে । সবাই বলতে ভদ্রলোকের মা-বাবা, দুই সন্তান, স্ত্রী ও স্ত্রীর এক আত্মীয় । খাওয়ার আগে তিনি বললেন, “স্যার, খাবারের সময় আমার মেয়েটাকে একটু খেয়াল রাখবেন । তার এক্টিভিটি পর্যবেক্ষণ করবেন।”

খাবার শেষে তিনি জানতে চাইলেন আমি কী দেখেছি । আমি তাঁকে বললাম, ” আপনার মেয়ে সবার আগে সব বাটি থেকে খাবার নিয়েছে । সাধারণত বাচ্চারা যেসব বিষয়ে প্রতিযোগিতা করে মাছের মাথা, মুরগির রান এর সবগুলো সে সবার আগে নিয়েছে । বড়দের প্রতি আমাদের সোসাইটিতে যে একটা আলাদা সমীহ থাকে আপনার মেয়ের মধ্যে তা ছিলো না।”

মেয়ের মা বললেন, “স্যার আপনাকে মূলত আমার মেয়েটাকে সোসাল হিউম্যান বানানোর অনুরোধ করতেই আমি এনেছি । আপনার কথা অনেক শুনেছি । আমার বিশ্বাস আপনি ওকে একজন পূর্ণ অনুভূতিপ্রবণ মানুষ বানাতে পারবেন । বলে কি জানেন! তার দাদু যখন বলে, “জামাইর বাইত গিয়াও কি এইতাই করবি!’ সে বলে, ‘আমি আগে খায়া থাকলে জামাইর বাড়ির মাইনষে খাইবো।’ স্যার অতি আদর ওদের চিন্তার বিকৃতি ঘটেছে । আপনি ওর পড়াশোনার পাশাপাশি একটু বুঝাবেন।”

বেশ কিছুদিন ভাবলাম । একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম “তুমি নাকি এসব বলো!” সে বেশ কনফিডেন্ট নিয়ে আমাকে বললো, “জ্বী স্যার । আমি এইসব আলগা ভদ্রতা দেখাইতে পারবো না।” আমি আবার বললাম, “তোমার বান্ধবীদের মধ্যে সবাই কাকে বেশি সমীহ করে?”

  • আমাকে। সেই বললো ।
  • কারণ কী? বললাম আমি ।
  • স্যার, আমি ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। সবার চেয়ে টল ও সুন্দরী। আব্বার টাকা পয়সাও বেশি। এইজন্যই সবাই আমাকেই বেশি দাম দেয়। আমিও একটু ভাব নিয়ে থাকি। আমাদের যৌথ কাজগুলির কোনটাই আমার করতে হয় না। আমার বান্ধবীরাই করে দেয় ।
  • যখন তোমরা একসঙ্গে কিছু খাও তখন কে সার্ভ করে? সবচেয়ে ভালো সীটটা ও ভালো পিসটা কে পায়?
  • আমি কোনদিন কাউকে একগ্লাস পানিও দিইনি। আর সবসময়ই খাবারের তুলনামূলক ভালো জিনিসটা সবাই আমাকেই দেয় ।

আমি তাকে বললাম, কোন একদিন তোমার বান্ধবীদের সার্ভ করবে । বাটির বড় গোশতের টুকরাটা অন্য বান্ধবীর পাতে দিয়ে দেইখো । খাবারের চেয়ে বেশি আনন্দ হবে । দেখো, তোমার ধারণা তুমি ভালো ছাত্রী, সুন্দরী, টল, ধনি ইত্যাদি কারণে ওরা তোমাকে বেশি গুরুত্ব দেয়! আসলে তোমার এই ধারণাটা সর্বাংশে ঠিক না । ওরা এটা করে কারণ, তারা অন্যকে জিতিয়ে আনন্দ পায় । তারা সার্ভ করাটা উপভোগ করে । এই আনন্দ আর উপভোগের কারণেই সবাই কাজ করতে চায়।”

একমাস পর একদিন আমার ছাত্রী বললো, “স্যার, আজকে আমি ক্লাস টিচারকে গ্লাসে করে পানি দিয়েছি । সবাই অবাক হয়ে আমাকে দেখতে শুরু করলো । ম্যাডামও এমনভাবে তাকালেন যেনো বিশ্বাসই করতে পারছেন না । খুব মজা পেয়েছি।” বলেই খলখল রবে হাসতে শুরু করলো ।

ইতোমধ্যেই তার ইন্টারমিডিয়েট শেষ হলো । মেডিকেলে চান্স পেলো । বাসায় আমাদের নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ালো । মা-বাবা আমাকে ধন্যবাদ দিলেন । দুয়া দিলেন । আমি আমার মেন্টরশীপ থেকে অব্যাহতি নিলাম । তারাও ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে গেলেন । নানান কারণেই যোগাযোগ আর চলমান থাকেনি ।

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

সাইফ সিরাজ

সব লেখা দেখুন

লেখাটি শেয়ার করুন

১টি মন্তব্য

  1. আ
    আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

    লেখাটা দারুণ লেগেছে ।আমার মত অমনোযোগী পাঠক হয়েও বেশ আনন্দ পেয়েছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.