ইলম ও যুগের সমন্বয়: কওমি শিক্ষার্থীদের নতুন পথচলা

২৯ মার্চ ২০২৬

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম— আম্মা বা’দ, প্রথমেই বলে রাখি, আমার প্রতিটি বাক্যই আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত মতামত, আর ব্যক্তি কখনওই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাই আমার বক্তব্যের ভুলগুলো বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সঠিক দিকগুলো থেকে আল্লাহ পাক আমাদেরকে উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমীন।

আসলে আজকের বিষয়বস্তুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী, আর তা হচ্ছে, ইলম ও যুগের সমন্বয়: কওমী শিক্ষার্থীদের নতুন পথচলা। আমাদেরকে প্রথমেই বুঝতে হবে এই নতুন পথচলার ব্যাপারটা কী এবং কেন এর বোঝাপড়া থাকা জরুরি। নতুন পথচলার মানে কি এইটা যে আমাদের পুরনো পন্থার কোথাও ভুল ছিল?

আসলে ব্যাপারটা তেমন না, বরং আমাদের পথ সবসময়ই একটাই। সেটা হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করে নিজেদেরকে এবং জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা। রকমারি.কম ও অন্যরকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ ভাই একবার বলেছিলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে নিজেকে এবং নিজের সাথে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে সম্ভব নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাই হলো তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আসলে সামগ্রিকভাবে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য এটাই হওয়া উচিত— নিজে অন্ধকার থেকে দূরে থাকা এবং সেইসাথে অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষদেরকে আলোর পথে নিয়ে আসা। তবে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার এই প্রক্রিয়াটা যুগের চাহিদা অনুযায়ী একেক সময় একেক রূপ ধারণ করেছে।

ইমাম শাফি (রহ.) যখন ইরাকে ছিলেন তখন তিনি ফিকহি মতামতের একটি ধারা তৈরি করেন, যেটি ফিকহের দুনিয়ায় ‘ফিকহে কদীম’ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে তিনি যখন মিশরে যান, তিনি সেখানকার পরিস্থিতি ও তাঁর নতুন উপলব্ধ জ্ঞানের আলোকে ফিকহে কদীমের অনেক মতামত পরিবর্তন করেন— যা ‘ফিকহে জাদীদ’ হিসেবে পরিচিত। আরও একটা উদাহরণের দিকে যদি আমরা তাকাই, ১১শ শতাব্দীর দিকে মুসলিম সমাজে একটি বিরাট বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সংকটের মূলে ছিল গ্রিক ফিলোসফি। অ্যারিস্টটল, প্লেটোর দর্শন তখন অনুবাদ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল মুসলিম সমাজে। ফলে অনেক ভালো এবং জ্ঞানী মুসলিমগণও আকীদাগতভাবে বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সেই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন ইমাম গাজালী (রহ.)। প্রথমেই তিনি সেই সকল ফিলোসফি ভালোভাবে অধ্যয়ন করেন, এরপর শরীয়ত, তাসাউফ আর আকীদার সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে সেগুলোকে যাচাই করেন। এর মাধ্যমে অনেক ফিলোসফিক্যাল ভ্রান্তিকেই তিনি ভুল প্রমাণ করেন, আর ইমাম গাজালীর এই গবেষণা ইসলামী ফিলোসফির একটি নতুন দুয়ার উন্মুক্ত করে পৃথিবীর কাছে।

কিন্তু ইমাম গাজালী যদি চিন্তা করতেন যে, পূর্বের উলামায়ে কেরাম যেহেতু ইসলামী ফিলোসফির এই দিকটাতে হাত দেননি, তাই তাঁর জন্যও এই দিকটা উন্মুক্ত করা ঠিক হবে না— তাহলে কিন্তু বিরাট সংখ্যক মানুষ ভুল পথে চলে যেত নিজেদের অজান্তেই। আর ইমাম গাজালী (রহ.) তাদেরকে কিন্তু ফিলোসফি অধ্যয়ন করতে বারণ করেননি, বরং তিনি ফিলোসফির সাথে ইসলামের একটি মিলবন্ধন তৈরি করে দিয়েছিলেন। আর এটাই হচ্ছে নতুন পথচলা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের জন্য এই নতুন পথচলার রূপরেখা বা রোডম্যাপ কেমন হতে পারে। এর উত্তরে আমি বলবো, আমাদের সবার পথচলা এক হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই, বরং সমাজে উপস্থিত সমস্যাগুলো সমাধানে ইসলাম কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, এর সন্ধান আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে। তবে যেকোনো সমস্যা সমাধানে সমাধানকারীকে যথেষ্ট পরিমাণ যোগ্য হতে হয়। আমি আজকে আমাদের এই নতুন পথচলায় যে সকল সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হতে পারি, সেগুলোর মধ্য থেকে আমার দৃষ্টিতে কয়েকটি প্রধান সমস্যা এবং তাদের সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করবো।

আমাদের প্রথম সমস্যার কথা যদি বলি তা হলো—

ভাষাগত অক্ষমতা

আসলে আমরা এমন এক পৃথিবীতে বর্তমানে বাস করছি যেখানে কমিউনিকেশন স্কিল এবং সেই সাথে ভাষাগত দক্ষতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদেরকে মাদ্রাসা থেকে বাংলা, আরবি, উর্দু, ফার্সি আর কিঞ্চিত ইংরেজি ভাষার শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু গড়পড়তা একজন মাদ্রাসা ছাত্র কয়টি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে? আমাদের বর্তমান সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজি ভাষার উপর নির্ভরশীল। বিশেষত মফস্বল কিংবা শহরের লোকজন বাংলায় কিঞ্চিত কাঁচা হলেও ইংরেজিতে বেশ পটু। আবার একটু অভিজাত বা বেশি ভদ্র পল্লিতে তো ইংরেজি না বললে যেন ওঠা যায় না!

আমাদের ভাষাগত এই জটিলতার কারণে হয়তো আমরা ঠিকভাবে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে পারছি না। এই মানুষগুলো হয়তো একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনতো যদি আমরা তাদের পছন্দের ভাষায় তাদের জন্য ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারতাম। ইসলাম তো সার্বজনীন ধর্ম, তাহলে শুধুমাত্র আরবির কোটরে আমরা কেন তাকে বন্দী করে রাখবো!

এখন কথা হচ্ছে, আমরা ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করবো কোন উপায়ে?

আসলে এর বিভিন্ন উপায় রয়েছে। আপনি যদি একদমই কাঁচা হন তাহলে নিজে নিজে প্রথমে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করে ছুটির সময়গুলোতে কোনো কোর্সে ভর্তি হতে পারেন। তবে আপনার যদি রিডিং পড়ার দক্ষতা ভালো থাকে, অর্থাৎ পড়তে পারেন কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয়— তাহলে আমি বলবো আপনি ছোট ছোট সহজ শব্দে লেখা ইংরেজি বই পড়ার চেষ্টা করতে পারেন। ইউটিউবে বিভিন্ন পডকাস্ট শোনার অভ্যাস করতে পারেন। এতে করে ভাষাগত দক্ষতা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিভিত্তিক আলাপের দক্ষতা গড়ে উঠবে। এইগুলোর মাধ্যমে আপনি ধীরে ধীরে ভয় আর জড়তা কাটিয়ে উঠবেন। আর এই দুইটা একবার কাটিয়ে উঠতে পারলে তখন আপনাকে আটকানো মুশকিল হয়ে যাবে।

এসব কিছুর বাইরেও আজকে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় হাজার রকমের সফটওয়্যার আর ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখান থেকে আপনি ভাষা শিখতে পারবেন। এই পদ্ধতি শুধু ইংরেজি নয়, বরং যেকোনো ভাষার জন্যই প্রযোজ্য।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা

আমরা দাওরায়ে হাদিসের বছরে এসে চিন্তা করতে শুরু করি যে আগামী বছর কী করবো। যাদের রেজাল্ট কার্ডে বড় বড় অক্ষরে মুমতাজ লেখা থাকে, তাদের জন্য এই লড়াইটা বেশ সহজ। কিন্তু ক্লাসে একশজন ছাত্র থাকলে তাদের মধ্যে ঠিক কতজনের কাছে এই সোনার হরিণ ধরা দেয়? হয়তো ১০ জন, কিংবা সর্বোচ্চ ২০/৩০ জন। তাহলে বাকিরা! মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতন দেওয়া বড় হুজুরও তার মাদ্রাসায় উর্দু কায়দা পড়ানোর হাইয়্যাতুল উলইয়াতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে সিরিয়ালে আসা ছাত্রটাকে আনতে চায়। তবে বেতন কিন্তু সেই পাঁচ থেকে দশ হাজারের গণ্ডিতেই!

আমাদের পড়াশোনা করতে হয় দীর্ঘ একটা সময়, বাইরের অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো সময় হয় না। আবার কর্মক্ষেত্রও সীমিত— মাদ্রাসা, মসজিদ কিংবা ওয়াজ মাহফিল করা। এসবের কারণে আমাদের আসলে সেই অর্থে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তৈরি হয় না। আপনি বলতে পারেন, তবুও তো তারা চলছে, আল্লাহ চালাচ্ছেন তাদেরকে স্বীয় রহমত ও বরকতের অছিলায়। নিঃসন্দেহে এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে আমি বলছি আমাদের সার্বজনীন হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে এমন একটি সমস্যা নিয়ে। আমাদের মধ্য থেকে উদ্যোক্তা তৈরি হয় না, যারা তাদের ব্যবসার মাধ্যমে নিজেরা স্বাবলম্বী হবে এবং ব্যবসার মহলেও ইসলামি দাওয়াতি কাজের চিন্তাচেতনা ছড়িয়ে দেবে। দেখেন, এই ক্ষেত্রে আমার একটা ব্যক্তিগত অবজারভেশন, যেটা আমি সেদিন সাবের ভাইয়ের সাথেও আলাপ করেছিলাম। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম— আপনি হেদায়েতুন্নাহু/কাফিয়ার বছরগুলোতে নিজেকে নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসেন। যদি আপনার মনে হয় ধর্মীয় ইলমের প্রতি আপনার যথেষ্ট একাগ্রতা আছে, ফিকহের জটিল ধাঁধা আপনাকে আনন্দ দেয়, একেকটা নতুন হাদিস জানার পর আপনার ভেতর নতুন দেশ জয় করার মতো অনুভূতি কাজ করে, তাহলে আপনি একজন যোগ্য তালিমি মুরব্বির অধীনে থেকে নিজেকে জ্ঞানচর্চায় পুরোপুরি বিলীন করে দিন।

কিন্তু ব্যাপারটা যদি একটু ভিন্ন হয়, যেমন জেনারেল সাবজেক্টগুলোতে আপনার বিশেষ আগ্রহ আছে, তথ্যপ্রযুক্তিতে আপনি বেশ ভালো, তাহলে আপনি হেদায়েতুন্নাহুর পর কোনো ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অ্যাডমিশন নিয়ে নেন। পাশাপাশি খুবই ছোট ছোট আকারে ব্যবসা-বাণিজ্য করার চেষ্টা করেন। যাতে লাভ হলে তো আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু লস হলে যাতে আপনার সর্বস্ব উজাড় না হয়ে যায়। এই ব্যবসাগুলো হতে পারে— চায়না থেকে ছোট ছোট প্রোডাক্ট এনে অনলাইনে বিক্রি করা, গ্রামের বাড়িতে পুকুর থাকলে বন্ধুদের সাথে নিয়ে খুবই অল্প পরিসরে সেখানে মাছ চাষ করার চেষ্টা করা, গ্রামে তৈরি হয় এমন সব জিনিস যেগুলো শহুরে লোকেদের খুব পছন্দ— সেগুলোর একটা ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা।

এতে করে হবে কী— আপনার মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে, আর সমাজের লোকজন ভাবতে শুরু করবে মাদ্রাসার ছেলেপুলেরা নিজেদের গণ্ডির বাইরেও বহু কিছু করতে পারে। এইসবের মধ্যে যদি আল্লাহ আপনাকে সফলতা দিতে থাকেন, তাহলে চেষ্টা করা— যেই ছেলেগুলো ইলমের জন্য নিজেদেরকে বিলীন করে দিলো, তাদের পেছনে একটা অ্যামাউন্ট ইনভেস্ট করতে আল্লাহর জন্য, দ্বীনের জন্য। সেটা হতে পারে সমাজের জন্য উপকারী তাদের কোনো গবেষণামূলক কাজ প্রকাশ করা বা অন্য কোনো কিছু। কিন্তু এটা হতে হবে ফি সাবিলিল্লাহ। 

এইগুলোর জন্য আপনি আপনার প্রতিদান আল্লাহর কাছ থেকে আখেরাতে তো পাবেনই, আর যেই ছেলেটার পেছনে আপনি ইনভেস্ট করলেন, দেখা গেলো সে ওই জায়গাটাতে বেশ ভালোভাবে নিজেকে তুলে ধরলো, তার নিজের একটা আয়ের পথ উন্মোচিত হলো। সর্বোপরি, সে নিজেও আপনার অছিলায় অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে উঠলো।

তথ্য ও প্রযুক্তির পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা

এই সময়ে এসে তথ্য প্রযুক্তির সম্পর্কে জ্ঞান না রাখা আসলে এক ধরনের অপরাধের কাতারে পড়ে। আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে এখন খুবই সীমিত আকারে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে, কিন্তু গোটা দুনিয়া যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে দক্ষতার লড়াই করছে, তখন আমাদেরকে শেখানো হচ্ছে কিভাবে Microsoft Office 2007 ভার্সন ব্যবহার করতে হয়! এই ইন্টারনেট জ্ঞান নিয়ে আমরা এই সমাজে লড়াই করতে পারবো না। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যেখানে প্রতি ছয় মাসে নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন করতে বলা হচ্ছে। সেটা হতে পারে ভাষাগত দক্ষতা, কোনো কারিগরী দক্ষতা বা ভিন্ন কোনো কিছু। সুতরাং যতক্ষন পর্যন্ত তারুণ্য আপনার নিকটে আছে, আপনাকে নিত্যনতুন দক্ষতা অর্জন করতেই হবে, নয়তো কিছু বছর পর সমাজ আপনাকে ছুড়ে ফেলে দেবে অদক্ষ ট্যাগ দিয়ে।

তাই আমি বলবো, তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে আপনাকে অবশ্যই বেসিক কম্পিউটার জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যেমন Canva ব্যবহার করা, Word/Excel-এর মতো সফটওয়্যারগুলো জানা, ইন্টারনেট ব্রাউজিং-এর খুটিনাটি এবং অবশ্যই AI-এর ব্যবহার শিখতে হবে। ChatGPT, Gemini, Canva, Grammarly, Sora সহ হাজার রকমের AI টুল আছে; এগুলোর প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা রাখে। আপনাকে এগুলোর ব্যবহার শিখতে হবে, সঠিকভাবে তাদেরকে প্রশ্ন করা—তাদের কাছ থেকে বেস্ট আউটপুট বের করা শিখতে হবে। Prompt Engineering শিখতে হবে।

এইগুলো আপনাকে আপনার দাওয়াতি কাজে তো অবশ্যই সাহায্য করবে, এমনকি আপনাকে আপনার ক্যারিয়ার গড়তেও সাহায্য করবে। আপনি যদি এই AI ব্যবহারে একটু দক্ষ হন, আপনি Python শিখতে পারেন, Machine Learning শিখতে পারেন, Data Analysis শিখতে পারেন। সর্বোপরি, এই দক্ষতা আপনাকে দীর্ঘ সময় উপকার দিবে, আর আপনাকে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু ইলম দিয়েছেন, আপনার উপকারে আসা বস্তু পুরো জাতিকে উপকৃত করবে, ইনশাআল্লাহ।

l সমাজ ও বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতা

আমরা আমাদের জীবনের দীর্ঘ একটা সময় ব্যয় করি এমন এক এডুকেশন সিস্টেমের ভেতরে যেখানে আসলে আমাদের সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে ইন্টার‌্যাক্ট খুব কম হয়। এর কারণে সোসাইটিতে চলমান বিভিন্ন ইস্যু, বিভিন্ন রকমের মানুষ এবং তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে জানার সুযোগ হয় না। মানুষজন আমাদেরকে স্বরন করে শুধুমাত্র ধর্মীয় কোনো ইস্যু হলে, আর আমরাও ধর্মীয় বাদে অন্য কোনো ইস্যুতে রিয়েক্ট খুব একটা করি না। যার ফলে সমাজের সাথে আমাদের বাস্তব বোঝাপড়াটা খুব ভালোভাবে গড়ে ওঠে না। আমরা বিভিন্ন স্তরের মানুষজন, তাদের সমস্যা ও সমাজের পরিবর্তন সম্পর্কে জানার খুব একটা সুযোগ পাই না।

এরপর অনেক ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞানের সংকীর্ণতার কারণে আমরা পিছিয়ে যাই— যেমন পারিবারিক সংকট, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রযুক্তির প্রভাবসহ নানান বিষয়ে আমাদের একাডেমিক পর্যায়ে ইন্ট্রোডাক্টরি লেভেলের কোনো শিক্ষাও থাকে না। ফলে অনেক সময় হীনমন্যতাতেও ভুগি, যে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেলে তখন কি করবো! এই ভেবে সামনে আগানোই হয় না।

আসলে আমরা ওই সময়টাও পাই না, যেই সময়টাতে আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবো। স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়েরা একাডেমিক লেভেল থেকেই সমাজ, সমাজের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে, পরবর্তীতে বিভিন্ন রকমের সামাজিক সংগঠন, ক্লাব কিংবা স্কাউটিং-এ যুক্ত হয়ে তারা সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেয়। ফলে সমাজের সাথে তাদের বোঝাপড়া আর আমাদের বোঝাপড়ার মাঝে বিরাট একটা পার্থক্য রয়েছে।

তবে এই সমস্যা সমাধানে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদেরকে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন—

Ø সমাজের বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে জানা।

Ø ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও সমসাময়িক বিষয়ে পড়াশোনা করা।

Ø মানুষের সাথে ধর্মীয় বিষয়গুলোর বাইরেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করা, স্কুল/কলেজের ছাত্রদের সাথে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন আলাপে অংশ নেওয়া।

এই বিষয়গুলো আপনাকে সমাজে সার্বজনীন হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে সময়। অর্থাৎ কখন করবো এই ধরনের কাজ! সারাদিন তো দরসেই কাটে! দেখুন, এই সমস্যার সমাধান আপনার নিজেকেই বের করতে হবে। তবে আমি বলবো, আপনি মাদ্রাসায় থাকাকালীন এই ব্যাপারগুলোতে কিতাবী পড়াশোনা চালিয়ে যান, পরবর্তী বিভিন্ন ছুটিতে কিংবা রমজানে এলাকার তরুণদের সাথে বসুন, অথবা মুরব্বিদের সাথে সমাজের কোনো একটি সংকট নিয়ে আলাপ করুন এবং তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করুন। এইভাবেই আল্লাহ চাইলে আপনি সমাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শিখবেন এবং সমাজও আপনাকে আরও আপন করে দেখবে।

l নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা

এই ব্যাপারটাও আসলে আমাদের পূর্বের আলোচনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের ইতিহাস/ঐতিহ্য, শিক্ষা—এই সবকিছুতেই কিন্তু নেতৃত্বের ব্যাপারটা জড়িত, কিন্তু সমাজের সাথে বোঝাপড়া না থাকায় আমরা আসলে পিছিয়ে পড়েছি। আমাদের মাদ্রাসার পরিবেশে প্রচুর পড়াশোনা হলেও বাস্তবে কোনো টিমওয়ার্ক কিংবা সাংগঠনিক কাজের সুযোগ থাকে না বললেই চলে। কিতাবভিত্তিক যেই জ্ঞান আমরা অর্জন করি, সেই তুলনায় নেতৃত্ব কিংবা টিম ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয় না। ফলে সেই অর্থে আমাদের একজন সার্বজনীন নেতা হয়ে ওঠা হয় না। একজন নেতাকে নীতি ও নৈতিকতার যেই দিকগুলো ধারণ করতে হয়, তা কিন্তু আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি আছে। তবে সামাজিক আরও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা কিংবা সমাজের সাথে কানেক্টেড না থাকায় আমাদের মধ্য থেকে সার্বজনীন নেতা তৈরি হয় না। তাই এই সকল বিষয়গুলো আমাদের অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। হয়তো আজই এর কোনো ফলাফল আসবে না, কিন্তু আপনার মাধ্যমে হয়তো সমাজে এর একটা চর্চা শুরু হবে এবং সেটা নির্দিষ্ট সময়ের পর মানুষজনের মধ্যেও প্রভাব ফেলবে।

সবশেষে আমি বলবো, ইলম ও যুগের সমন্বয় এর ব্যাপারটা অনুধাবন করা এবং সেই অনুয়ায়ী নিজেদেরকে গড়ে তোলা এই সময়ে আমাদের জন্য অনিবার্য একটা কাজ । আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা.-এর নির্দেশনা অনুসরণ করেই আমরা নিজেদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করি, কিন্তু সেই লক্ষ্যকে যুগের বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে পারলেই আমরা সমাজে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারি। ভাষাগত দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, তথ্য ও প্রযুক্তির জ্ঞান, সমাজ ও বাস্তবতার বোঝাপড়া এবং নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ক্ষমতা—এই পাঁচটি ক্ষেত্রের উন্নয়ন ছাড়া আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে সার্বজনীন মানুষ হতে পারব না।

আমাদের দায়িত্ব হলো নিজেকে ক্রমাগত শিক্ষিত ও সক্ষম করা, এবং সেই সঙ্গে সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান প্রদান করা। এটা করা আসলে সহজ নয় বরং খুবই কঠিন, তবে চেষ্টা আমাদেরকে করতেই হবে এবং সফলতা ল্লাহর হাতে । আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য এই নতুন পথচলা সহজ করুন সেই দোয়াই করবো সর্বদা ।

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

ইবনু তাসলীম

ইবনে তাসলীম সমকালীন তরুণ অনুবাদক ও সাহিত্যপ্রেমী। সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি একজন বইপ্রেমি। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বিক্রমপুরে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নানামুখী শিক্ষার ভেতর দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। মাদ্রাসায় শরহে বেকায়া অধ্যয়নের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জেনারেল ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষাও তার জীবনপথের অংশ। বিচিত্র শিক্ষাধারার এই সংমিশ্রণ তার চিন্তা ও লেখায় একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। পড়াশোনাকে তিনি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেননি, বরং এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়ে, নানা অভিজ্ঞতা ও পাঠের মধ্য দিয়ে নিজের বোধকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সব লেখা দেখুন

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

লেখাটি শেয়ার করুন

৩টি মন্তব্য

  1. K
    Khaled

    খুব সুন্দর

  2. র
    রাবতা

    ধন্যবাদ

  3. K
    Khaled

    অনেক সুন্দর

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.