মানবিক সেতু

আমার পিচ্চি মেয়ে দুটো প্রায়ই গল্প বলার জন্য চেপে ধরে। কোনো কোনো সময় আরো কিছু পিচ্চি জোগাড় করে রীতিমতো দল পাকিয়ে ফেলে। তখন আর ছুটার সুযোগ হয় না। একান্ত ব্যস্ততা না থাকলে ছুটতে অবশ্য চাইও না। শিশুরা আমাদের কাছে যে সকল অধিকারের দাবিদার, গল্প শোনানো এর মধ্যে অবশ্যই অন্যতম। শিশুদের গল্প বলার বিশেষ সুবিধা হলো এই—আপনি যাই বলবেন, তাতেই তারা মহা খুশি। যদি বলেন দুই দেশে ছিল একটি ঘোড়া, তখন মহা উৎসাহে চোখমুখ নাচিয়ে বলবে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাপ্পর? তাপ্পর? এদিকে দুই দেশে একটি ঘোড়ার বিদ্যমানতা যে হিসাব বিদ্যা অনুযায়ী গোলযোগপূর্ণ এবং একান্ত দার্শনিক বুঝাপড়া ছাড়া রীতিমতো অবাস্তব, সে নিয়ে তাদের কোনোই দুশ্চিন্তা নেই। ফলে, ঘটনার ভিতর দিয়ে ঘোঁটটা যেমনই পাকাই, ওদের আনন্দটা ওরা নিজের মতো করে বুঝে নেয় ঠিকই। এর ভিতর দিয়ে আরো একটি লাভ হয় এই—শিশুদের সাথে চমৎকার একটি সেতু তৈরী হয়। এই সেতুটি ধরে আমি যেমন ওদের হৃদয়ে আনাগোনা করতে পারি, তেমনি ওরাও আমার ভিতরে এসে দিব্যি বসে থাকে। এর বাইরে আমি গল্প করি পরিবারের বড়দের সাথ, বন্ধুদের সাথে এবং পরিচিত আধা পরিচিত নানান মানুষের সাথে। আমরা গল্পের বিষয়টিকে সাধারণত এর ভিতরেই সীমিত করে ফেলি। কিন্তু আমাদের জীবনজুড়ে সম্পর্ক তো আসলে বিচিত্র। সেসবের ভিতর বিশেষ কিছু সম্পর্ক আছে। যেমন, ছাত্র শিক্ষক, ছোট ভাই বড় ভাই, অগ্রজ ও অনুজ, অভিভাবক অধীনস্ত, কর্মচারি মালিক, বাবা ছেলে। এ জাতীয় সম্পর্কগুলো প্রকৃতির বিচারে কিছুটা অস্বস্তিপূর্ণ। কারণ শিক্ষাদান, নির্দেশ, উপদেশ, তত্ত্বাবধান, জবাবদিহিতা, শাসন—এ জাতীয় ভারী বিষয়গুলো এসবের সাথে জড়িয়ে থাকে। আনন্দের ব্যাপার এই যে, গল্প আমাদেরকে এই অস্বস্তিটা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কারণ, গল্প একটি বিচিত্র পথ। অদ্ভুত সুন্দর এই পথটি শিক্ষা উপদেশ শাসনসহ সব দিকেই গমন করে, কিন্তু ছোট-বড়জনিত মানসিক দূরত্ব বা কর্তৃত্বের সেই অস্বস্তিটা থাকে না। সেটি ভেঙ্গে তার স্থলে অসাধারণ একটি নৈকট্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে। যদি খেয়াল করি দেখব, অপরিচিত মানুষদের সাথে আমাদের সমস্ত সম্পর্কের সূচনা হয় গল্প দিয়েই। নারী পুরুষের যে প্রেম, এর সূচনায় মূলত কিছু গল্পের মুহূর্তই থাকে। কিন্তু তারপর কি ফুরিয়ে যায়? মোটেও নয়। বরং গল্প তখন নতুন মাত্রা লাভ করে।
কিন্তু আমাদের এই অভিজ্ঞতাটি অহরহ হয় যে, আমরা দেখি বাবা ছেলের সম্পর্কটা উষ্ণ নয়। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটা উসখুশ করতে থাকে এই ভেবে যে, কখন সাক্ষাতের সময়টি শেষ হবে। একজন পিতা সবসময়ই চান, তার ছেলেটা তার সাথে বন্ধুর মতো মিশুক, সহজভাবে কথা বলুক, পাশে বসে আনন্দিত হোক; কিন্তু যখন টের পান ছেলে তার সামনে এসে স্বস্তি পাচ্ছে না, এই অনুভূতি তাকে ভিতরে ভিতরে কষ্ট দেয়। কিন্তু সম্পর্কের সূত্রটি আবিস্কার করতে কেউই মনোযোগী নন—না পিতা, না পুত্র। সামাজিকভাবে একটি কথা হয়তো আমাদের মনস্তত্বের ভিতরে ঢুকে গেছে—ছেলেকে নজরদারিতে রাখতে হবে, জবাবদিহি করতে হবে, প্রয়োজনীয় ধমকটা দিতে হবে। ইতিবাচক কথা বলতে আমরা বুঝি একান্ত দরকারি আলাপটা নির্মোহভাবে সেরে নেওয়া। আর, কোনো কারণে হৃদয় যদি দ্রবিভূত হয়, তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত সুদীর্ঘ সময় নিয়ে সুগভীর উপদেশ দিয়ে দিই। একই সমস্যা হয় ছোট ভাই বড় ভাইয়ের মধ্যে, ছাত্র উস্তাদের মধ্যে। উপদেশ একটি ভারী জিনিস, শিক্ষাদানও। জবাবদিহি তো মানুষমাত্রই রীতিমতো অসহনীয়। ফলে মানসিক দূরত্বটা থেকেই যায়। বন্ধুত্বটা হয় না, সঙ্গের আনন্দটা পাওয়া যায় না এবং সাহচর্যের যে ইতিবাচক প্রভাব, তা লভ করা হয়ে ওঠে না। এই বন্ধ্যাত্ব থেকে গল্প আমাদের মুক্ত করে। গল্পে কী থাকে? দৃশ্য ও ছবি থাকে, আবেগ ও কল্পনা থাকে, জীবন ও স্মৃতি থাকে, ঘটনা ও সংবেদ থাকে এবং দৃষ্টি ও দৃষ্টির ভঙ্গি থাকে। ফলে গল্পের ভিতর দিয়ে একটি হৃদয় অন্য একটি হৃদয়ে স্পন্দিত হয়। একে অপরের কাছে আসে। মানবিক সমস্ত দুর্বোধ্যতা অতিক্রম করে একে অপরের কাছে খোলা কিতাবের মতো সহজপাঠ্য হয়।
এ প্রসঙ্গে কল্পিত একজন শিক্ষকের একটি ডায়েরির পাতা পাঠ করা যাক। তিনি লিখেন:
আমার জীবনে গল্প বিষয়টিকে আমি সবসময়ই অত্যাধিক গুরুত্ব দিতে আগ্রহী। আমি আমার ছাত্রদের সাথে সবচেয়ে বেশি পালন করি যে জিনিসটি, তা হলো এই গল্প। এর ফল হয়েছে এই, কোনো কোনো ছাত্র আমার রুমে এসে সালাম বিনিময়ের পর চোখেমুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যদি জিজ্ঞেস করি, কিছু কি বলার ছিল? সে না সূচক মাথা নেড়ে বলে—‘এমনি, গল্প করতে এসেছি। আপনার কথা শুনতে ভালো লাগে।’ এটা শুনে আমার অসম্ভব আনন্দ হয়। আমি যে খুব গুছিয়ে কথা বলি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু এই ছেলেগুলো এটুকু টের পেয়ে গেছে—আমি তাদেরকে উপদেশের পর উপদেশ দিয়ে বিরক্ত করে ফেলব না। সে সহজ একটি আনন্দের ভিতর দিয়ে চিন্তা আদান প্রদান করতে পারবে। কিন্তু আয়োজন করে উপদেশ না দিলেও অঘোষিতভাবে উপদেশ, নির্দেশ, শিক্ষা এসব কি থাকে না? নিশ্চয়ই থাকে। গল্পের আবহে তা আলাদারূপে দ্রষ্টব্য হয় না—এই যা। মাঝে মাঝে ক্লাসে পড়ানো শেষ হওয়ার পর বলি, আমি তো অনেক্ষণ বললাম, এবার তোমরা বলো। ওরা হাসে। এরপর সবাই মিলে পাঁচ সাত মিনিটের গল্প হয়। এই গল্প আমাদের এতোক্ষণের ক্লান্তিকে দূর করে দেয়। পড়ার পরিমাণ ঠিক রেখে কখনো কখনো ক্লাসে গিয়েই ঘোষণা দিই আজকে কোনো পড়া হবে না। চলো, আমরা বরং গল্প করি। এবং আমি জানি, এটা গল্প নয়, বরং ছেলেগুলো নিজের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার প্রশস্ত রাজপথ। আমি তাদেরকে দেখতে পাব এবং একদমই দরকারি কথাগুলো গল্পের আমেজে বলে ফেলতে পারব। এই উপদেশ তখন আরোপিত নয়; স্বতঃস্ফুর্ত। এমনিভাবে, জ্ঞান ও ধারণাগত দিক থেকে তাদের যে অপরিপক্কতা ও শূন্যস্থানগুলো, সেগুলোতে আমি আমার প্রয়োজনীয় চিন্তাগুলো পরিমিতভাবে স্থাপিত করতে পারব।
ছাত্রদের সাথে উস্তাদের আচরণটি কেমন হবে, ছেলের সাথে পিতার সম্পর্কটি কোন আঙ্গিকে গড়ে উঠবে, এ বিষয়ে সম্ভবত সমাজে দুটো প্রান্তিক ধারণা আছে। কারো মতে, বাবা ছেলের মাঝে শ্রদ্ধা ও সম্মানপূর্ণ একটি দূরত্ব থাকতে হবে। এটা তো সত্য। কিন্তু এই যৌক্তিক দূরত্বের কথা বলে সচেতনভাবে বা অসচেতনভাবে আমরা যে দূরত্বটার চর্চা করি, তা কি শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সেই ব্যবধানটুকু? নাকি মূলত এর নাম দিয়ে এক ধরণের সম্পর্কহীনতা? অপরদিকে কারো মত হলো, সম্পর্কটা হতে হবে বন্ধুর মতো। কিন্তু সেখানেও পরিমিতি বজায় না থাকার দরূণ তা দরকারি গাম্ভীর্য ও দূরত্বটুকু মিটিয়ে ‘বাবাসুলভ’ আচরণটি পর্যন্ত বহাল থাকে না। আমি মনে করি দুটোই ক্ষতিকর। দরকার হলো ভারসাম্য।
এমনিভাবে গল্প করতে গিয়ে আমরা যদি অসংলগ্ন আলোচনা করতে শুরু করি, কিংবা ভাঁড়ামি করি, তাও নিশ্চয়ই ক্ষতিকর। এই সমস্ত সতর্কতা মাথায় নিয়েই আমি শেষ পর্যন্ত গল্পের পক্ষে। গল্প আমাদের মধ্যে যে সেতু তৈরী করে, এর কোনো বিকল্প নেই।


১৩টি মন্তব্য
অনেক সুন্দর
ধন্যবাদ
গুরুত্বপূর্ণ
লেখাটি পড়ে উপলব্ধি করলাম, গল্প মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। চমৎকার লিখেছেন।
মাশাআল্লাহ, জাযাকাল্লাহ।
আপনার গদ্য খুব ভালো লাগে!
সুন্দর।
দারুণ
সত্যিই, গল্প মানুষের জীবনে নতুন করে পথচলার শক্তি যোগান করে। বহুলা থাকাকালীন হুজুরের এরকম অজস্র গল্পের সাক্ষী হয়েছি।
সত্যিই, গল্প মানুষের জীবনে নতুন করে পথচলার শক্তি যোগান করে। বহুলা থাকাকালীন হুজুরের এরকম অজস্র গল্পের সাক্ষী হয়েছি।
সাবের চৌধুরী ভাইয়ের আলোচনা বরাবরই মনোমুগ্ধকর। অনেক অনেক ভালো লিখেছেন।
ধন্যবাদ। আমাদের সাথেই থাকুন।
খুব ভালো