চৈন্তিক যোগ্যতার আগে চাই আত্মিক যোগ্যতার উন্নয়ন

২৯ মার্চ ২০২৬

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বিভ্রম বোধহয় এই যে—যেকোনো জাগতিক সংকট, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কিংবা সামষ্টিক বিপর্যয়ের দায় আমরা একচেটিয়াভাবে চাপিয়ে দিই চিন্তার ঘাড়ে। পরিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্র থেকে সভ্যতার সর্বস্তরেই যখনই কোনো ক্রান্তিকাল উপস্থিত হয়, তখনই লোকমুখে ভেসে আসে পরিচিত সুর—পরিকল্পনার অভাব ছিল, চিন্তায় ঘাটতি ছিল, দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংকীর্ণ। যেন চিন্তাই সব সমস্যার উৎস, আবার চিন্তাই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান।

এই চারপাশে যে চিন্তার ঝড়োহাওয়া বইছে, মানুষের ভাবনায় যে বদ্ধমূল হয়ে বসে থাকা তথাকথিত ‘ধারণা’র রাজত্ব—তা দেখলে মনে হয়, চিন্তার পরিশুদ্ধতা ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ নেই। নতুন ভাবনার রূপায়ন, চৈন্তিক যোগ্যতার বিকাশ আর বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষই যেন মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি। অথচ এই ধারণাই এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা; এটি মূলত ‘অমূলক চিন্তা’রই এক সুসজ্জিত রূপ।

মানুষ ভাবতে চায় না যে, সলতের গোড়ায় লাল কেরোসিন রেখে চিমনি যতবারই মোছা হোক না কেন—পরক্ষণেই আবার অন্ধকার নেমে আসবেই। উৎসে যেখানে দূষণ, সেখানে বাহ্যিক পরিশুদ্ধতা কতক্ষণ টিকবে? আত্মার শুদ্ধতার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে কেবল চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করার এই উদগ্র আহ্বান আসলে গোড়া না উপড়িয়ে আগায় পানি ঢালার শামিল। বিস্ময়ের বিষয় হলো—এই বাস্তবতা জেনেও তথাকথিত চিন্তকরা এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততায় ভুগে চলেছেন।

অথচ আল্লাহ তায়ালা যখন নবী-রাসূলদের দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন, তখন সেখানে কী গভীর ভারসাম্য আর প্রজ্ঞার পরিচয়! কুরআনের ভাষ্যে নবীর দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চারটি মৌলিক কাজ—আল্লাহর বাণী তিলাওয়াত করা, আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা দেওয়া, প্রজ্ঞা ও বিধানের পথ দেখানো এবং সর্বোপরি মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। লক্ষ করুন, আত্মিক পরিশুদ্ধতা এখানে কোনো পার্শ্ববর্তী বিষয় নয়; বরং নবুয়তের মিশনের এক কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। যখন নবীর দায়িত্বেই আত্মার উন্নয়নকে অগ্রগণ্য করা হচ্ছে, তখন আমরা কারা যে একে অবহেলা করে কেবল চিন্তার জয়গান গাই!

অন্তরের চোখ দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করুন—হালিমা (রা.)-এর কোলে লালিত শিশুকালে অথবা মিরাজে গমনের রাতে প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিনা চিরে দেওয়ার ঘটনাগুলোর অন্তর্নিহিত দর্শন। শিরচ্ছেদ নয়, মস্তিষ্কে কোনো অস্ত্রোপচার নয়—সিনা চিরে হৃদয় পরিশুদ্ধ করার এই দৃশ্য আমাদের কী শেখায়? এখানেই কি স্পষ্ট নয় যে, চিন্তা নয়—আত্মাই সকল শুদ্ধতার উৎস? মগজ ধোলাইয়ের আগে আত্মা ধোলাই যে অপরিহার্য, এই সত্যের চেয়ে আর কী-ই বা স্পষ্ট হতে পারে?

চিন্তাই যদি মুক্তির চূড়ান্ত পথ হতো, তবে ফেরাউনের তখত-সম্মুখে দাঁড়িয়ে মুসা আলাইহিস সালাম দোয়া করতেন না—“রাব্বিশরাহ লী সাদরি” (হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন)। তিনি বলতেন—“রাব্বিশরাহ লী রাসি” (হে আমার রব, আমার মাথা বা চিন্তা প্রশস্ত করে দিন)। কিন্তু তিনি জানতেন, দায়িত্ব বহনের শক্তি আসে প্রশস্ত বক্ষ থেকে, বিশুদ্ধ হৃদয় থেকে—শুধু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি থেকে নয়।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মানুষের ভালো-মন্দ নির্ণয়ে কখনো চিন্তার কথা বলেননি। তিনি ইঙ্গিত করেছেন মানুষের অভ্যন্তরে অবস্থানরত এক মাংসপিণ্ডের দিকে—যা ভালো হলে পুরো দেহ ভালো হয়ে যায়, আর খারাপ হলে পুরো দেহই খারাপ হয়ে পড়ে। সেটিই হলো হৃদয়, সেটিই আত্মার কেন্দ্র।

সুতরাং, চিন্তার পরিশোধনের আগে আত্মার পরিচর্যায় ব্রতী হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। জাগতিক সংকটের মুখোমুখি হলে কেবল পরিকল্পনার খাতায় নয়, সরাসরি দ্বারস্থ হই এলাহি দরবারে। রোনাজারিতে যে শক্তি আছে, তা কোনো কৌশলগত বিশ্লেষণে নেই। তসবির দানায় দানায় যে বিপ্লব ঝরে পড়ে, তা বহু বক্তৃতায়ও জাগে না। আর শেষ রাতের জায়নামাজে যে তাহলিল-তাকবিরের ঝড় ওঠে, সেটিই পারে নিঃশব্দে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে।

আত্মা শুদ্ধ হোক—চিন্তা আপনাআপনি আলোকিত হবে। উৎস ঠিক হলে প্রবাহও ঠিক হবে।

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

লাবীব হুমায়দী

ছোটবেলা থেকেই পাঠক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সেখান থেকেই ধীরে ধীরে লেখক হয়ে ওঠা। টুকটাক গল্প, গদ্য, আর কখনো কখনো বিরহের কবিতায় নিজেকে প্রকাশ করেন। পাশাপাশি সময় সময় গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ও নিবন্ধও লেখেন। এ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে; সাহাবাজীবন ও অবিস্মরণীয় মনীষী পাঠকমহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। মুসলিম ইতিহাসের প্রতি রয়েছে তাঁর গভীর অনুরাগ। ইতিহাসচর্চাকে কেন্দ্র করে তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন নানা অনুসন্ধানে। কওমি মাদরাসা থেকে পড়াশোনার যাত্রা শেষ করে এখনো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয়ের জ্ঞানার্জনের পথে ছুটে চলছেন। বর্তমানে ‘রাবতা’-এর ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তামাদ্দুনের আলোয় তারুণ্যকে এগিয়ে নিতে তিনি রাবতাকে গড়ে তুলছেন এক অনন্য পরিসরে।

সব লেখা দেখুন

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

লেখাটি শেয়ার করুন

০টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.