অবিস্মরণীয় মনীষী: মুহিউসসুন্নাহ আনওয়ারুল হক চৌধুরী রাহিমাহুল্লাহ

মুহিউসসুন্নাহ আল্লামা শায়েখ আনওয়ারুল হক চৌধুরী রহ. ছিলেন এই উপমহাদেশে নারী দ্বীনি শিক্ষার জাগরণে এক অনন্য দিকপাল, সমাজসংস্কারক ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ। তাঁর জীবন ছিল দ্বীন, ইলম, আধ্যাত্মিকতা এবং সমাজ সংস্কারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষত নারীদের দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে তাঁর যে সাহসী ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ, তা তাঁকে যুগের একজন অসাধারণ মনীষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানাধীন দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৬ সালে তাঁর জন্ম হয় মৌলভীবাজার জেলার বুদ্ধিমন্তপুর গ্রামে, নানার বাড়িতে। তাঁর বংশধারা ছিল অত্যন্ত গৌরবময় ও আলোকোজ্জ্বল। বংশপরম্পরা হযরত শাহ জালাল মুজাররাদে ইয়ামেনী (রহ.)-এর অন্যতম সাথী হযরত শাহ আলাউদ্দিন (রহ.)-এর সূত্রে খলীফাতুর রাসূল হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে।
তাঁর নানা সৈয়দ আব্দুর রউফ চৌধুরী ছিলেন বুদ্ধিমন্তপুর গ্রামের সনামধন্য ও প্রতাপশালী জমিদার। তাঁর মা ছিলেন সেই জমিদার সাহেবের একমাত্র কন্যা। কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার পর সন্তান-বিচ্ছেদের বেদনা সহ্য করতে না পেরে জমিদার সাহেব কন্যা ও জামাতাকে নিজের বাড়িতেই রেখে দেন। ফলে শায়েখ আনওয়ারুল হক চৌধুরী (রহ.)-এর শৈশবের প্রথম কয়েকটি বছর নানার বাড়িতেই কাটে। সেখানেই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। তিনি আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে, নানার বাড়িতেই মা-বাবা ও নানির কাছে তাঁর আলিফ, বা, তা, ছা পড়া শুরু হয়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়ে তিনি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
পরবর্তীতে তিনি নিজ বাড়ি সুলতানপুরে চলে আসেন। ধর্মানুরাগী জমিদার পরিবার হওয়ায় তাঁদের বাড়ি আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বাড়িতে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যেখানে বহু আলেম-ওলামা শিক্ষা লাভ করেছেন। প্রখ্যাত আলেম শায়খুল হাদীস আল্লামা নূরুদ্দীন গহরপুরী (রহ.)-ও এই মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। শায়েখ আনওয়ারুল হক চৌধুরী (রহ.) এখানেই ভর্তি হয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এ মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত আব্বাস আলী খাঁপুরী (রহ.)। একই সময়ে তিনি তাঁর দাদার সান্নিধ্য লাভ করেন, যিনি ছিলেন সর্বজনস্বীকৃত একজন কামেল ওলী।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৫২ সালের ১ মার্চ তৎকালীন বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সে সময় এ মাদ্রাসায় দরসে নেজামীর কিতাবসমূহ খ্যাতিমান বুযুর্গ আলেমদের দ্বারা পাঠদান করা হতো। নিষ্ঠা ও মেধার সাথে পড়াশোনা করে তিনি ১৯৫৯ সালে কামিল (তাকমীল ফিল হাদীস) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং সেখান থেকে ফারেগ হন। এর পাশাপাশি তিনি ১৯৫৮ সালে প্রাইভেট হাই মাদ্রাসা থেকে সমাপনী পরীক্ষাও দিয়েছিলেন।
সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে প্রথমে তিনি তাঁর চাচা মৌলভী হেকীম বশীরুল হক চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন, যিনি সিলেট তিব্বি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা। পরে তিনি তাঁর বড় চাচা ফখরুল মুহাদ্দিসীন শায়খুল হাদীস আল্লামা লুৎফুল হক চৌধুরীর সান্নিধ্যে চলে আসেন। আল্লামা লুৎফুল হক ছিলেন সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ডের রেজিস্ট্রার। তিনি একজন কামেল-মুকাম্মাল ওলী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর সান্নিধ্য শায়েখ আনওয়ারুল হক চৌধুরী (রহ.)-এর জীবনে গভীর আধ্যাত্মিক প্রভাব বিস্তার করে।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহী হননি। আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি ব্যবস্থার অধীন হওয়ায় এর কিছু কার্যক্রম তিনি মনেপ্রাণে অপছন্দ করতেন। অন্যদিকে আশপাশে উল্লেখযোগ্য কোনো কওমি মাদ্রাসাও ছিল না। ফলে পড়াশোনা শেষে তিনি কিছুটা দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। কিন্তু তাঁর অন্তরে তখন থেকেই সমাজ সংস্কারের এক বৈপ্লবিক চিন্তার উন্মেষ ঘটতে থাকে। এই চিন্তার বীজ ছিল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যেই নিহিত।
এই সময় তিনি তাঁর চাচা আল্লামা লুৎফুল হক চৌধুরীর কাছে পরামর্শ চান। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি সিলেট শহরের জিন্দাবাজারে “হক্বানী স্টোর” নামে একটি কাপড়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যবসা তাঁর জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বিভিন্ন আলেম-উলামা ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব প্রায়ই তাঁর দোকানে আসতেন। তাঁদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হতে থাকেন। বিশেষ করে চতুল নিবাসী কামেল বুযুর্গ মাওলানা ইসমাইল চতুলী (রহ.)-এর সান্নিধ্য তাঁর উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর মাধ্যমেই তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের সাথে পরিচিত হন। এ সময় পাকিস্তানের এলাহাবাদ থেকে আগত বুযুর্গ হযরত শাহ মাশহুদ (রহ.) সিলেটের শাহজালাল দরগায় অবস্থান করলে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগও তিনি পান, যা তাঁর জীবনের আধ্যাত্মিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তীতে তিনি ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগা জামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইস্তেখারার মাধ্যমে তাঁর নাম নির্ধারিত হওয়ায় তিনি এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি ফজর ও আসরের নামাজের পর নিয়মিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে তা’লীম দিতেন এবং দ্বীনি জ্ঞান প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
সমাজের ধর্মীয় অধঃপতন দেখে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করেন কীভাবে সমাজকে সত্যিকার অর্থে সংস্কার করা যায়। দীর্ঘ চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের পর তিনি উপলব্ধি করেন যে সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো নারী। মা যদি দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হন, তবে সন্তানরাও সঠিক পথে গড়ে উঠবে এবং একটি দ্বীনদার সমাজ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “আল-জামেয়াতুত্ত্বায়্যিবাহ সুলতানপুর মহিলা মাদরাসা”। পাশাপাশি তিনি নিজ বাড়িতে মহিলাদের জন্য তা’লীমী মজলিস চালু করেন।
সে সময় মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ধারণা সমাজে খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। এমনকি অনেকেই এ বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কিন্তু তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ও সাহসিকতার সাথে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেন। শুরুতে মহিলা শিক্ষক পাওয়াও ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী চিন্তার ফলেই আজ দেশে-বিদেশে অসংখ্য মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নারী শিক্ষার পাশাপাশি তিনি পুরুষদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন “হযরত শাহ সুলতান (রহ.) মাদ্রাসা” এবং সর্বসাধারণের দ্বীনি জাগরণের লক্ষ্যে “তাহরীকে এ’লায়ে কালিমাতুল্লাহ” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শাখা দেশে ও বিদেশে বিস্তৃত হয়েছে এবং তাঁর ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন এলাকায় দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
এছাড়াও মুহিউসসুন্নাহ রহ. আঞ্জুমানে তালিমুল কুরআন বাংলাদেশ দের উপদেষ্টা ছিলেন আমৃত্যু। আঞ্জুমানের প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল কুররা আলী আকবর সিদ্দিক রহ. এন সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিলো। ১৯৯৩ সাল থেকে শায়খে ভানুগাছি রহ. এর সাথে মুহিউস সুন্নাহ রহ. এর ভালো একটা পরিচয় গড়ে উঠে। আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠা করার পর থেকেই ভানুগাছি রহ. তাদের উভয় সম্পর্কটা আরো গভীর হয়ে উঠে। আঞ্জুমানের প্রথম মহিলা সনদ সুলতানপুর মহিলা মাদরাসা থেকেই শুরু হয়৷ মহিলাদের সনদ চালু হওয়ার পর এটি ব্যাপক সাড়ক পড়ে সবার মাঝে।
শায়েখ আনওয়ারুল হক চৌধুরী (রহ.) ছিলেন একজন খাঁটি আশেকে রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। তিনি মানুষের মধ্যে পরিত্যক্ত সুন্নতগুলো পুনরুজ্জীবিত করার জন্য নিরলস চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই তাঁকে “মুহিউসসুন্নাহ” বলা হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল, বিনয়ী ও মানবপ্রেমী। বহু দরিদ্র পরিবার তাঁর দানের ওপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করত এবং মানুষের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় তিনি অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়াতেন।
জীবনের শেষ সময়েও তিনি ইবাদত-বন্দেগি ও আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন থাকতেন। প্রায়ই তিনি দোয়া করতেন— “হে আল্লাহ! তোমার সাথে সাক্ষাতের প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের মৃত্যু দাও।” অবশেষে ২০২০ সালের ১ জুন, সোমবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৮৭ বছর।
তাঁর ইন্তেকালে দ্বীনি অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, চিন্তাধারা এবং নারী শিক্ষার বিপ্লবী উদ্যোগ আজও সমাজকে আলোকিত করে চলেছে। সত্যিই তিনি ছিলেন এমন এক মনীষী, যার চিন্তা ও কর্ম যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখাবে।
লেখক: ডিরেক্টর রাবতা



০টি মন্তব্য