বিজয়, বিভ্রান্তি ও বিবেকের দায়: একটি অসমাপ্ত সাক্ষ্য

টানা সপ্তাখানেক প্রচণ্ড দাবদাহের পর আজকে সন্ধ্যা থেকে বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে । মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে, চারিদিকে থমথমে একটা আবহ । জানালাটা পুরোপুরি খুলে পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম আয়েশ করে, হাতে এলিজাবেথ বীচারের আঙ্কল টমস কেবিন । আমার ধারনাকে সত্যি করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো । চেয়ার নিয়ে সরে এসে টেবিলে বসলাম, কিন্তু পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না কিছুতেই । স্মৃতি থেকে এখনও রক্তের দাগগুলো মুছে ফেলতে পারিনি, পারবো বলেও মনে হয় না । প্রতিবছর জুলাই ফিরে এলেই আমার স্মৃতির জগতটা উলটপালট হয়ে যাবে আবারও । জুলাই শহীদদের জন্য কিছু না করতে পারার ব্যর্থতা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে । এক বছর আগেও ভাবতে পারিনি জেনারেশন যুমার এতো কিছু করার ক্ষমতা রাখে ।
আমি তখনও পরবাসেই, দেশ থেকে সাত হাজার মাইল দূরের এক শহরে ভাগ্যের সন্ধ্যানে ছুটে বেড়াচ্ছি— অথবা হয়তো যাপিত জীবনের কারাগারে বন্দী হয়ে আছি । সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত না থাকায় তখনও আসলে বুঝতে পারছিলাম না যে দেশে কি হতে যাচ্ছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছে শিরোনামে ইউটিউবে বেশ কিছু সংবাদ চোখে পড়েছে তবে বিস্তারিত তখনও জানিনা অথবা জানার চেষ্টাও করিনি । আন্দোলন হওয়া আর সেখানে পুলিশের লাঠিচার্জ তো আর নতুন কিছু না আমাদের দেশে । এক দশক আগের মে মাসের এক রাতে তো এরচাইতেও জঘন্য ঘটনা ঘটতে দেখেছি । তবে সেদিন হুট করে এক বন্ধুর ফোন পেয়ে হুঁশ ফিরলো, সে জিজ্ঞেস করলো দেশের খবর রাখছি কি না । উত্তরে না শুনে বেশ অবাক হলো । তার ভাষ্যমতে দেশের পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীপ্রধান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদেরকে ‘রাজাকার’ বলে সম্বোধন করেছেন । ফলে ছাত্রদের রাগ ও ঘৃণা ভয়াবহভাবে ফুসে উঠেছে, তারা এখন সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । আস্তে আস্তে ঘটনা আরও খারাপের দিকে গেলো, সরকারী মদদে লালিত হওয়া পুলিশ বাহিনী নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষন শুরু করলো । পাছে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর ছড়াছড়ির ভয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলো সরকার । প্রায় এক সপ্তাহ নাগাদ চললো ইন্টারনেট বন্ধের সেই বিশ্রী কান্ড । সারাদিন ফোন করে যাচ্ছিলাম আব্বু-আম্মুর মোবাইলে, পুরো সপ্তাহে একবার আব্বুর সাথে একটু কথা হলো তবেও তাতেও কথা কেটে কেটে যাচ্ছিলো । জানলাম তারা ভালো আছে । ছোট ভাইটাকে বললাম সাবধানে থাকতে ।
এরপর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি, কাজে যাই, বাড়ি ফিরি— কিন্তু কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিলাম না এসবে । আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ব্যাপারটাকে বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে শুরু করেছে । ইউরোপের বেশকিছু দেশেও প্রবাসী বাঙালিরা SAVE BANGLADESHI STUDENTS ব্যানার নিয়ে ছাত্রদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছেন ।
ইতোমধ্যেই হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদরা তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে জনগনের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন । অবশ্য ততদিনে আন্দোলনও একটি সাধারন ছাত্র আন্দলোন থেকে জনগনের সরকার বিরোধী আন্দলোনের আকার ধারন করেছে । রিকশা চালক, খেটে খাওয়া দিনমজুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর থেকে শুরু করে সর্বশ্রেণীর মানুষজন এসে দাড়ালো ছাত্রদের পাশে । অপরিকে পাল্লা দিয়ে নিহতের সংখ্যাও বাড়ছে । হেলিকপ্টার থেকে চালানো গুলিতে শিশু বাচ্চা নিহত হওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটলো । তখনও মনকে আশ্বাস দিতে পারছিলাম না যে এসবকিছুর বিনিময়ে হলেও একদিন আমরা এর আশানুরূপ সমাপ্তি দেখতে পারবো । আসলে সেই ছোটবেলা থেকে এই একটা মানুষকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দেখতে দেখতে হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে তারও একদিন পতন হবে ।
হুটকরেই ফাহাম আব্দুস সালাম তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন । ভদ্রলোক বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অনেক আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বললেও এইবার একলাফে যেনো কয়েকশো ধাপ আগে চলে গেলেন । তরুনরা বেশ ভালোভাবেই তাকে গ্রহন করলো ।
বন্ধু একদিন বললো আজকে বেশকিছু জেলাশহরে মিছিলরত ছাত্রদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে আর খুব সম্ভবত তারই ফলশ্রুতিতে লং মার্চ টু ঢাকা একদিন পিছিয়ে আনা হয়েছে এবং তা আগামীকালই । প্রায় সারারাত জেগে দুইজনে আলাপ করলাম । কাল কি হতে পারে, নতুন কোনো সরকার আসলে কে হবেন তিনি— আরও নানান বিষয় । তবে আমাদের সব আশা-ভরসা টিকেই ছিলো ‘যদি’র উপরে । তখনও আমার মনের একটা অংশ বলছিলো রক্তের সমুদ্র পেরিয়ে হলেও ‘মহাজন’ তার ক্ষমতা ধরে রাখবেন । অপর একটা অংশ নিভু নিভু প্রদিপের মতো আশার আলো জ্বালিয়ে রাখছিলো । পরদিন সকালে কাজ থেকে ছুটি চাইবো চাইবো করেও শেষ পর্যন্ত মন পরিবর্তন করলাম এই ভেবে যে, কিছু একটাতে ব্যস্ত থাকলে বোধহয় পেরেশানি কম লাগবে । কিন্তু না— কাজে আমি মন দিতে পারছিলাম না কোনোভাবেই । এখান সেখান থেকে উড়ো খবর পেতে লাগলাম ছাত্র নেতারা সবাই নিহত হয়েছেন, আবার কেউ বা বলছেন ক্ষমতাসীন মন্ত্রীপ্রধান সেনাপ্রধানের সাথে আলোচনায় বসেছেন । কিন্তু বিশ্বাস কাকে করবো বুঝতে পারছিলাম না । এদিকে মনের অবস্থা শোচনীয়, একে তো এতো দূরে তারউপর নির্ভরযোগ্য সংবাদ পাচ্ছি না । ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাত বৃদ্ধাঙ্গুলি থেমে গেলো, বাধ্য হলো থেমে যেতে । কয়েক মুহুর্ত বুঝতে পারলাম না কি করা উচিত, অত্যাধিক আনন্দের প্রথম কয়েক মুহুর্ত বুঝি এমনই হয় । টের পেলাম চোখ দুটো বড় হয়ে গিয়েছে । ফাহাম আব্দুস সালামের পোস্ট থেকে জানতে পারলাম ‘মহাজন’ তার গাট্টি বোস্কা নিয়ে তার বন্ধুর কাছে উড়াল দিয়েছেন । সাথে সাথে ফোন করলাম বাসায়, আব্বু-আম্মুর সাথে কথা বললাম । বন্ধুকে ফোন করলাম, দেখলাম মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায় । কারো কারো হাতে মিস্টির বাক্স, ছোট ছোট বাচ্চারা হাতে বাঁশি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে এখানে ওখানে । আনন্দ মুখর পরিবেশ চারিদিকে, অবশ্য সেই বাচ্চাগুলো তাদের আনন্দের কারন বুঝতে পেরেছিলো বলে আমার মনে হয় না, তবে উতসবের বাতাস তাদেরকেও মোহগ্রস্থ করে ফেলেছিলো । এরপরের কাহিনীও যথেষ্ট রোমাঞ্চকর! টানা কয়েকদিন দেশে কোনো আইনের প্রয়োগ না থাকা, দেশজুড়ে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়া । আর ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় লোকজনের এলাকা জুড়ে মার্সিডিজ আর জার্মান শেফার্ড নিয়ে টহল দেয়া কিংবা রাতের বেলা রাস্তার মাঝে নাইট পার্টির আয়োজন করে ফেলা— এ সবই ছিলো আন্দোলন পরবর্তী দিনগুলোর নিয়মিত সংবাদ । প্রতিদিন রাত হলেই নতুন কোনো গুজবের আগমনও এই সময়েরই অংশ । এক সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এলো, তার মন্ত্রী সভায় ছাত্রনেতারা জায়গা পেলো, আস্তে আস্তে দেশ স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করলো । এই চেষ্টা কতটা সফল আর কতটা বিফল সেটা নিয়ে দীর্ঘ তর্কের সুযোগ আছে । প্রত্যেকের চাহিদার জায়গা ভিন্ন, কেউ পিচ ঢালা সড়ক চায় তো কেউ পেটে দুবেলা ভাত চায় ঠিকমতো । সমাজের নানান স্তরের মানুষদের নানান রকমের চাহিদা আর এইসবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধার দায়িত্ব সরকারের । তাই যখন শ্রেনী ‘ক’ ভাবছে সরকার খুব ভালো কাজ করছে শ্রেনী ‘খ’ হয়তো ভাবছে আগের সরকারই ভালো ছিলো । তবে এসবকিছুর পরও যখন দেখি জুলাইয়ে নিহত কোনো শহিদের স্ত্রী না খেয়ে আছে, তখন খারাপ লাগে । যখন জানতে পারি জুলাইয়ে আহত ছেলেটা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নিজেকে খুব অপরাধী বোধ হয় । সফল হয়েও এতোটা ব্যর্থ কেনো আমাদের আন্দোলন? এসব প্রশ্নের উত্তর বোধকরি কোনো একদিন জানতে পারবো তবে ততদিনে হয়তো ছোট্ট ফাতেমা অনেক বড় হবে । জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া বাবার জন্য সে আর প্রতিদিন অপেক্ষা করে বসে থাকবে না । সে জানতে পারবে কারা তার বাবার হন্তারক । হয়তো সেদিন সে এটাও জেনে যাবে যে কাদের ব্যর্থতায় দুমুঠো ভাতের জন্য তার মা সারাটা জীবন কি অমানুষিক পরিশ্রম করে গেলো ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো সেদিন ফাতেমার বিবেক কি এই দুই শ্রেনীর মানুষকে ভিন্ন কাতারে রাখতে পারবে?




০টি মন্তব্য