গিয়াসউদ্দিন বলবন— শাসন, সংস্কার ও দিল্লি সালতানাতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

২৮ মে ২০২৬


সুলতানি আমলের ইলবারি বা মামলুক সুলতানদের তিনজন সুলতান বিশেষভাবে যোগ্য ও দক্ষ ছিলেন । তন্মধ্যে সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন বলবন । যিনি একাধারে প্রায় ৪০ বছর দিল্লির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন । প্রথম ২০ বছর নায়েবে মুমালিক তথা রাষ্ট্রের উপ-শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তী প্রায় ২১ বছর সুলতান হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন । তিনি সুলতান ইলতুতমিসের বিশেষ দাস-আমির গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদের ‘চেহেলগানি’ বা ‘চল্লিশ আমির’ বলা হতো । এরা সবাই সুলতানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করত । সুলতানের দরবারে তাদের বিশেষ জায়গা ছিল । যার কারণে প্রত্যেকে রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও সমরনীতিতে হাতে-কলমে জ্ঞান অর্জন ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন

তার জামাতা সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ ইন্তিকালের আগে বলবনকে সুলতানি পদ অলংকৃত করতে বলেন । অবশ্য সুলতানের ওয়ারিশ না থাকায় এমনিতেই তিনি সুলতান হওয়ার হকদার ছিলেন । এছাড়াও ২০ বছর নায়েবে মুমালিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে তার প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ।

১২৬৬ সালে যখন তিনি সুলতান হন, তখন রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল ছিল । যদিও তিনি উজির ছিলেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তার হাতে না থাকায় অনেক বিশৃঙ্খলা তিনি সমাধান করতে পারেননি । এছাড়াও তার প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য চেহেলগানিরা তো ছিলই । ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি রাজদরবারকে পারসিক আদলে সাজান । সুলতানের আসন অন্যান্য আসনের উপরে স্থাপন করেন এবং সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধি ও প্রভাব বিস্তার করতে তিনি নিজের পাশে সবসময় নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করেন । তখনকার শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানির বর্ণনামতে, তিনি কেবল অভিজাত আমিরদের চাকরি দিতেন । নিচু বংশের এবং ভারতীয় মুসলিমদের খুব কমই উচ্চপদে চাকরি দেওয়া হতো । বরং প্রায় ১৫০ নিচু বংশের আমলাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় ।
তিনি সেনাবাহিনীতে সংস্কার করেন এবং সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেন । প্রতিটি প্রধান পদে যোগ্য সেনানায়ক নিয়োগ করেন । তার সেনাবাহিনীকে এতটা শক্তিশালী করেন যে, অনায়াসে তিনি নতুন রাজ্য জয় করতে পারতেন । কিন্তু তিনি নতুন রাজ্য বিস্তারে কোনো অভিযান পরিচালনা করেননি । আমিরদের অনেকেই সুলতানকে নতুন রাজ্য জয়ের জন্য বের হতে বললে তিনি বলতেন, একজন সুলতানের দায়িত্ব হলো আগে নিজের অধীনস্থ রাজ্য হেফাজত করা এবং রাজ্যে সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা । তাঁর সালতানাতে তিনি শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন । তার সালতানাতের এক টুকরো ভূমিও কেউ দখল করতে পারেনি।

সুলতান ইলতুতমিস ইন্তিকালের পর তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগের কারনে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল । রাজপুত ও মেওয়াতিদের হাঙ্গামা দিল্লির সালতানাতের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল । রাজধানীর আশপাশে তারা লুটতরাজ চালাত । ফলে ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়ে পড়ে । এলাকাবাসির কোন নিরাপত্তা ছিল না । মেওয়াতি ডাকাতরা ঘন জঙ্গলের আশপাশের এলাকাগুলো থেকে ডাকাতি করে গহিন জঙ্গলে আশ্রয় নিত । দিল্লিতে ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা । সুলতান বলবন রাজধানীতে শান্তি কায়েম করার জন্য এদের সমূলে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন । তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের এলাকাগুলোতে হামলা করেন । বারানির মতে, সুলতানের নির্দেশ ছিল— মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধ ছাড়া সকল বিদ্রোহীকে হত্যা করতে । এভাবে কঠোর অভিযানের ফলে লুটতরাজ নির্মূল হয় ও রাজপুতরা আর বিদ্রোহ করার সাহস পায়নি । ফলে রাজধানীতে স্থিরতা আসে । তিনি পুরো জঙ্গল পরিষ্কার করে রাস্তা তৈরি করেন এবং সীমান্ত এলাকায় দুর্গ স্থাপন করেন । দুর্গগুলোতে দক্ষ সেনাবাহিনী নিযুক্ত করেন । ফলে পলাতকরা দ্বিতীয়বার আক্রমণ করার সাহস পায়নি ।
বাংলায় তুঘরিলের বিদ্রোহও দমন করেন তিনি । তুঘরিল ছিলেন সুলতানের দক্ষ ও চৌকস সেনাপতিদের একজন । দূরবর্তী বাংলায় দায়িত্ব পাওয়ার পর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কুপরামর্শ তাকে বিদ্রোহী হতে উৎসাহিত করে । সুলতান বলবন কয়েক দফা অভিযানের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন ।

অন্যদিকে মঙ্গোল আক্রমণও দিল্লি সালতানাতের জন্য বড় হুমকি ছিল । বলবন মঙ্গোলদের একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও তারা সুযোগ পেলেই সীমান্তে হামলা চালাত । তাই তাকে সর্বদা সীমান্ত প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো । রাজধানীর অরাজকতা দূরীকরণ, বাংলার বিদ্রোহ দমন এবং মঙ্গোল আক্রমণ প্রতিহত করার মাধ্যমে তিনি দিল্লি সালতানাতকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম হন ।

তিনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু সংস্কার আনয়ন করেন। তার নীতি ছিল— তার সালতানাতে যেন অত্যধিক ধনী কিংবা অত্যধিক দরিদ্র কোনো শ্রেণি তৈরি না হয় । কারণ অতিরিক্ত ধনসম্পদ বিদ্রোহের উৎস হতে পারে এবং চরম দারিদ্র্য মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে । তিনি বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত কঠোর ছিলেন । শরিয়ত ও সুলতানি আইন— উভয়ের আলোকে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন । আমির থেকে সাধারণ প্রজা— সকলেই আইনের দৃষ্টিতে সমান ছিল । কোনো আমির যদি দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি জুলুম করত, তবে সে শাস্তি থেকে রেহাই পেত না ।

সুলতান বলবনের পুরো সালতানাতের দিকে ইনসাফের দৃষ্টিতে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তিনি যেমন বিদ্রোহীদের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন, তেমনি সাধারণ জনগণের প্রতি কোমল ছিলেন । সালতানাতের এমন দূরাবস্থায় এরকম শাষকই প্রয়োজন ছিল । ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্যক্তি জীবনে অনেক পরিবর্তন আনলেও সালতানাত শাষনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি শরিয়া আইন কায়েম করতে পারেননি । ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি তার সমকক্ষ আমিরদের বিশ পান করিয়ে হত্যা করেন । বারানি বলেন, তার চাচাত ভাই শের খানকে তিনি বিষ পান করিয়ে হত্যা করেন । যিনি চেহেলগানির একজন ছিলেন এবং যিনি দীর্ঘকাল যাবত সফলতার সাথে মঙ্গোলদের প্রতিহত করে আসছিলেন । দরবারে সম্মান জানাতে মাথা ঝুকানো ও শুধু তুর্কি অভিজাতদের উচ্চপদের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি ছিলো অতিরঞ্জিত । তবে তবে সামগ্রিক শাষনব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে ভাল দিক অনেক বেশি । ন্যায়বিচার, অরাজকতা দূরীকরণ, বিদেশি শক্তি থেকে সালতানাতকে রক্ষা, মদ্যপান ত্যাগ, আলেম-দরবেশের দরবারে গমন এবং তাদের সুপারিশ গ্রহণ অবশ্যই ভালো গুণ । কিন্তু কিছু ইতিহাসবেত্তা তার কয়েকটা মন্দ বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তার মত স্বৈরশাষক খুব কমই এসেছে । তবে এমন অনেক সত্যানুরাগী ঐতিহাসিক আছেন যারা তার প্রতি অবিচার করেননি ।
১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই মহান সুলতান তিরোধান ত্যাগ করেন ।

তথ্যসূত্র:
*তারিখে ফিরোজশাহি
-জিয়াউদ্দিন বারানি
*তাবাকাতে নাসিরি
-মীনহাজ-ই সিরাজ
*ভারতে মুসলিম শাষনের ইতিহাস
-ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক
*আদিমধ্য ও মধ্যযুগে ভারত
-সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

ইমরান হুসাইন

ইমরান হুসাইন বর্তমানে যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসায় মেশকাত জামাতে অধ্যয়নরত। পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসার মানবিক বিভাগে আলিম দ্বিতীয় বর্ষেও পড়াশোনা করছেন । তাঁর গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট জেলায় । ইতিহাস তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়; অবসর সময়ে ইতিহাসভিত্তিক বই, উপন্যাস ও নানা প্রবন্ধ পড়তে ভালোবাসেন । আরবি সাহিত্য নিয়েও রয়েছে তাঁর গভীর আগ্রহ, সুযোগ পেলেই পড়াশোনা করেন এ বিষয়ে । পড়াশোনার বাইরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মতবিনিময় ও সময় কাটানো তাঁর নিত্যদিনের একটি অংশ ।

সব লেখা দেখুন

লেখাটি শেয়ার করুন

০টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.