গিয়াসউদ্দিন বলবন— শাসন, সংস্কার ও দিল্লি সালতানাতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

সুলতানি আমলের ইলবারি বা মামলুক সুলতানদের তিনজন সুলতান বিশেষভাবে যোগ্য ও দক্ষ ছিলেন । তন্মধ্যে সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন বলবন । যিনি একাধারে প্রায় ৪০ বছর দিল্লির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন । প্রথম ২০ বছর নায়েবে মুমালিক তথা রাষ্ট্রের উপ-শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তী প্রায় ২১ বছর সুলতান হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন । তিনি সুলতান ইলতুতমিসের বিশেষ দাস-আমির গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদের ‘চেহেলগানি’ বা ‘চল্লিশ আমির’ বলা হতো । এরা সবাই সুলতানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করত । সুলতানের দরবারে তাদের বিশেষ জায়গা ছিল । যার কারণে প্রত্যেকে রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও সমরনীতিতে হাতে-কলমে জ্ঞান অর্জন ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন
তার জামাতা সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ ইন্তিকালের আগে বলবনকে সুলতানি পদ অলংকৃত করতে বলেন । অবশ্য সুলতানের ওয়ারিশ না থাকায় এমনিতেই তিনি সুলতান হওয়ার হকদার ছিলেন । এছাড়াও ২০ বছর নায়েবে মুমালিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে তার প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ।
১২৬৬ সালে যখন তিনি সুলতান হন, তখন রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল ছিল । যদিও তিনি উজির ছিলেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তার হাতে না থাকায় অনেক বিশৃঙ্খলা তিনি সমাধান করতে পারেননি । এছাড়াও তার প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য চেহেলগানিরা তো ছিলই । ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি রাজদরবারকে পারসিক আদলে সাজান । সুলতানের আসন অন্যান্য আসনের উপরে স্থাপন করেন এবং সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধি ও প্রভাব বিস্তার করতে তিনি নিজের পাশে সবসময় নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করেন । তখনকার শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানির বর্ণনামতে, তিনি কেবল অভিজাত আমিরদের চাকরি দিতেন । নিচু বংশের এবং ভারতীয় মুসলিমদের খুব কমই উচ্চপদে চাকরি দেওয়া হতো । বরং প্রায় ১৫০ নিচু বংশের আমলাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় ।
তিনি সেনাবাহিনীতে সংস্কার করেন এবং সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেন । প্রতিটি প্রধান পদে যোগ্য সেনানায়ক নিয়োগ করেন । তার সেনাবাহিনীকে এতটা শক্তিশালী করেন যে, অনায়াসে তিনি নতুন রাজ্য জয় করতে পারতেন । কিন্তু তিনি নতুন রাজ্য বিস্তারে কোনো অভিযান পরিচালনা করেননি । আমিরদের অনেকেই সুলতানকে নতুন রাজ্য জয়ের জন্য বের হতে বললে তিনি বলতেন, একজন সুলতানের দায়িত্ব হলো আগে নিজের অধীনস্থ রাজ্য হেফাজত করা এবং রাজ্যে সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা । তাঁর সালতানাতে তিনি শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন । তার সালতানাতের এক টুকরো ভূমিও কেউ দখল করতে পারেনি।
সুলতান ইলতুতমিস ইন্তিকালের পর তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগের কারনে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল । রাজপুত ও মেওয়াতিদের হাঙ্গামা দিল্লির সালতানাতের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল । রাজধানীর আশপাশে তারা লুটতরাজ চালাত । ফলে ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়ে পড়ে । এলাকাবাসির কোন নিরাপত্তা ছিল না । মেওয়াতি ডাকাতরা ঘন জঙ্গলের আশপাশের এলাকাগুলো থেকে ডাকাতি করে গহিন জঙ্গলে আশ্রয় নিত । দিল্লিতে ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা । সুলতান বলবন রাজধানীতে শান্তি কায়েম করার জন্য এদের সমূলে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন । তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের এলাকাগুলোতে হামলা করেন । বারানির মতে, সুলতানের নির্দেশ ছিল— মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধ ছাড়া সকল বিদ্রোহীকে হত্যা করতে । এভাবে কঠোর অভিযানের ফলে লুটতরাজ নির্মূল হয় ও রাজপুতরা আর বিদ্রোহ করার সাহস পায়নি । ফলে রাজধানীতে স্থিরতা আসে । তিনি পুরো জঙ্গল পরিষ্কার করে রাস্তা তৈরি করেন এবং সীমান্ত এলাকায় দুর্গ স্থাপন করেন । দুর্গগুলোতে দক্ষ সেনাবাহিনী নিযুক্ত করেন । ফলে পলাতকরা দ্বিতীয়বার আক্রমণ করার সাহস পায়নি ।
বাংলায় তুঘরিলের বিদ্রোহও দমন করেন তিনি । তুঘরিল ছিলেন সুলতানের দক্ষ ও চৌকস সেনাপতিদের একজন । দূরবর্তী বাংলায় দায়িত্ব পাওয়ার পর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কুপরামর্শ তাকে বিদ্রোহী হতে উৎসাহিত করে । সুলতান বলবন কয়েক দফা অভিযানের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন ।
অন্যদিকে মঙ্গোল আক্রমণও দিল্লি সালতানাতের জন্য বড় হুমকি ছিল । বলবন মঙ্গোলদের একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও তারা সুযোগ পেলেই সীমান্তে হামলা চালাত । তাই তাকে সর্বদা সীমান্ত প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো । রাজধানীর অরাজকতা দূরীকরণ, বাংলার বিদ্রোহ দমন এবং মঙ্গোল আক্রমণ প্রতিহত করার মাধ্যমে তিনি দিল্লি সালতানাতকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম হন ।
তিনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু সংস্কার আনয়ন করেন। তার নীতি ছিল— তার সালতানাতে যেন অত্যধিক ধনী কিংবা অত্যধিক দরিদ্র কোনো শ্রেণি তৈরি না হয় । কারণ অতিরিক্ত ধনসম্পদ বিদ্রোহের উৎস হতে পারে এবং চরম দারিদ্র্য মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে । তিনি বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত কঠোর ছিলেন । শরিয়ত ও সুলতানি আইন— উভয়ের আলোকে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন । আমির থেকে সাধারণ প্রজা— সকলেই আইনের দৃষ্টিতে সমান ছিল । কোনো আমির যদি দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি জুলুম করত, তবে সে শাস্তি থেকে রেহাই পেত না ।
সুলতান বলবনের পুরো সালতানাতের দিকে ইনসাফের দৃষ্টিতে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তিনি যেমন বিদ্রোহীদের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন, তেমনি সাধারণ জনগণের প্রতি কোমল ছিলেন । সালতানাতের এমন দূরাবস্থায় এরকম শাষকই প্রয়োজন ছিল । ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্যক্তি জীবনে অনেক পরিবর্তন আনলেও সালতানাত শাষনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি শরিয়া আইন কায়েম করতে পারেননি । ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি তার সমকক্ষ আমিরদের বিশ পান করিয়ে হত্যা করেন । বারানি বলেন, তার চাচাত ভাই শের খানকে তিনি বিষ পান করিয়ে হত্যা করেন । যিনি চেহেলগানির একজন ছিলেন এবং যিনি দীর্ঘকাল যাবত সফলতার সাথে মঙ্গোলদের প্রতিহত করে আসছিলেন । দরবারে সম্মান জানাতে মাথা ঝুকানো ও শুধু তুর্কি অভিজাতদের উচ্চপদের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি ছিলো অতিরঞ্জিত । তবে তবে সামগ্রিক শাষনব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে ভাল দিক অনেক বেশি । ন্যায়বিচার, অরাজকতা দূরীকরণ, বিদেশি শক্তি থেকে সালতানাতকে রক্ষা, মদ্যপান ত্যাগ, আলেম-দরবেশের দরবারে গমন এবং তাদের সুপারিশ গ্রহণ অবশ্যই ভালো গুণ । কিন্তু কিছু ইতিহাসবেত্তা তার কয়েকটা মন্দ বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তার মত স্বৈরশাষক খুব কমই এসেছে । তবে এমন অনেক সত্যানুরাগী ঐতিহাসিক আছেন যারা তার প্রতি অবিচার করেননি ।
১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই মহান সুলতান তিরোধান ত্যাগ করেন ।
তথ্যসূত্র:
*তারিখে ফিরোজশাহি
-জিয়াউদ্দিন বারানি
*তাবাকাতে নাসিরি
-মীনহাজ-ই সিরাজ
*ভারতে মুসলিম শাষনের ইতিহাস
-ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক
*আদিমধ্য ও মধ্যযুগে ভারত
-সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়


০টি মন্তব্য