আধুনিক সমাজে বিকৃত আচরণ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার

সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার

বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা দৈনন্দিন আলোচনায় এমন সব হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যা সুস্থ বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ভাতিজির সঙ্গে চাচার বিকৃত যৌনাচার, ভাগ্নির সঙ্গে মামার অমানবিক সম্পর্ক, এমনকি মেয়ের সঙ্গে বাবার জঘন্য আচরণের সংবাদ আজ আর বিরল কিছু নয়। একইভাবে বাবার হাতে সন্তান খুন, সন্তানের হাতে পিতা হত্যা কিংবা মায়ের হাতে সন্তানের নির্মম মৃত্যু—এসব ঘটনা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একসময় এ ধরনের বর্বরতাকে “জাহেলিয়াতের যুগের” আচরণ হিসেবে দেখা হতো। সভ্য সমাজ সেসব কর্মকাণ্ডকে ঘৃণার চোখে দেখত এবং সভা-মঞ্চে নিন্দার সঙ্গে বর্ণনা করত। ১৯৩৭ সালে মৌলভীবাজারের লংলা পরগনার জমিদার-কন্যা করিমুন্নেসা কর্তৃক তাঁর স্বামী কটু মিয়া হত্যার ঘটনাকে সমাজ এক বিরল নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখেছিল। মানুষ বিস্মিত হয়ে বলেছিল—“একজন নারী কীভাবে নিজের স্বামীকে হত্যা করতে পারে!” অর্থাৎ তখনকার সমাজে এমন ঘটনা ব্যতিক্রমী ও ভয়াবহ বলে বিবেচিত হতো।

কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে সমাজে বিকৃত আচরণ ও পারিবারিক সহিংসতা এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তা শুনে অবাক হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে। প্রশ্ন জাগে—এই নৈতিক অবক্ষয়ের পেছনে মূল কারণ কী?

অনেকের বিশ্লেষণে স্মার্টফোন ও প্রযুক্তির অপব্যবহারকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়। আজ থেকে এক-দেড় দশক আগেও গ্রামবাংলায় স্মার্টফোন ছিল না। তখন বিটিভিই ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা টেলিভিশনের সামনে জড়ো হয়ে সিনেমা দেখত। ছায়াছবির আবেগঘন দৃশ্য দর্শকদের মনেও প্রভাব ফেলত। শিশু-কিশোরদের মাঝেও এর প্রতিফলন দেখা যেত। তারা সিনেমার নায়কদের অনুকরণ করত, লাথি-ঘুষির দৃশ্য বাস্তবে প্রয়োগের চেষ্টা করত।

তৎকালীন অধিকাংশ চলচ্চিত্রে সমাজের বিধিবিধান অতিক্রম করে প্রেম ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হতো। কিশোর-কিশোরী ও যুবসমাজ আবেগের বশবর্তী হয়ে সেসব চরিত্রকে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করার প্রবণতায় আক্রান্ত হতো। অর্থাৎ গণমাধ্যমের প্রভাব তখনও ছিল, তবে তার সীমাবদ্ধতা ছিল পরিবেশ ও উপকরণের মধ্যে।

বর্তমানে সেই স্থান দখল করেছে স্মার্টফোন। বরং স্মার্টফোন আগের সব মাধ্যমকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। টেলিভিশন যেখানে পরিবারকেন্দ্রিক ও সীমিত ছিল, স্মার্টফোন সেখানে ব্যক্তিগত, বহনযোগ্য এবং সীমাহীন। একজন ব্যক্তি নির্জনে বসে পৃথিবীর যেকোনো অশ্লীলতা, সহিংসতা কিংবা বিকৃত কনটেন্ট খুব সহজেই দেখতে পারছে। যে বিষয়গুলো একসময় টেলিভিশনে প্রচার করা সম্ভব ছিল না, আজ তা কয়েক সেকেন্ডে মোবাইলের স্ক্রিনে পৌঁছে যাচ্ছে।

বিশেষ করে পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত বিনোদনের সহজলভ্যতা মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘদিন অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্টে আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের নৈতিক সীমারেখা হারিয়ে ফেলে। আত্মসংযম দুর্বল হয়ে যায়, মানবিকতা কমে যায় এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে পরিবার নামক নিরাপদ আশ্রয়ও অনেক সময় হিংস্রতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

তবে এ ধরনের অপরাধের জন্য কেবল স্মার্টফোনকে এককভাবে দায়ী করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। সাধারণত কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে। যেমন—

  • পরিবারে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার দুর্বলতা
  • পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত কনটেন্টের সহজলভ্যতা
  • মাদকাসক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব
  • শিশুদের নিরাপত্তা ও সচেতনতার ঘাটতি
  • পারিবারিক ভাঙন ও সহিংস পরিবেশ
  • মানসিক অসুস্থতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণহীনতা
  • অপরাধের বিচারহীনতা বা দুর্বল আইন প্রয়োগ
  • সামাজিক লজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীদের নীরব থাকা
  • প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অসুস্থ বিনোদন সংস্কৃতি

ইসলামের দৃষ্টিতে এসব আচরণ শুধু সামাজিক অপরাধ নয়; বরং জঘন্য কবিরা গুনাহ এবং মানবতার বিরুদ্ধে বড় জুলুম। ইসলাম পরিবারকে একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করে। তাই লজ্জাশীলতা, পর্দা, আত্মসংযম, চরিত্র গঠন এবং শিশুদের নিরাপত্তার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছে। কুরআন ও হাদিসে দৃষ্টি সংযম, অশ্লীলতা পরিহার এবং হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এক্ষেত্রে করণীয় বিষয়গুলো হতে পারে—

১. পরিবারে ঈমানি ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা।
২. শিশুদের “Safe Touch” ও “Unsafe Touch” সম্পর্কে সচেতন করা।
৩. পর্নোগ্রাফি ও মাদক থেকে সমাজকে রক্ষা করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
৪. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা।
৫. অপরাধ গোপন না করে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৬. মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল ও পরিবারে চরিত্র গঠনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৭. ভুক্তভোগীদের দোষারোপ না করে সহানুভূতি ও সহায়তা প্রদান করা।
৮. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও নৈতিকতা পুনর্গঠন করা।

সবশেষে বলা যায়, সমাজ যখন আল্লাহভীতি, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ হারাতে শুরু করে, তখন অমানবিকতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রূপ নিতে থাকে। প্রযুক্তি নিজে কখনো সম্পূর্ণ দোষী নয়; বরং প্রযুক্তির অপব্যবহার, দুর্বল নৈতিক শিক্ষা এবং আত্মিক শূন্যতাই সমাজকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। তাই শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে নয়, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব স্তরে নৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটানোর মাধ্যমেই এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

পাঠকের ভালোবাসাই রাবতার শক্তি। এক কাপ চায়ের দামে আমাদের পাশে থাকতে পারেন।

বিস্তারিত
লেখক

হাতিম আল ফেরদৌসী

সব লেখা দেখুন

লেখাটি শেয়ার করুন

২টি মন্তব্য

  1. র
    রাবতা

    সুন্দর

  2. খ
    খালেদ

    মাশাআল্লাহ

আপনার মন্তব্য লিখুন


Review Your Cart (0)

Your cart is currently empty.