উষর রাতের অনাবাদী মাঠে

আমি পাঠক দেখলে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি, আর লেখক দেখলে প্রণাম অথবা কৃপার মহার্ঘ ঢেলে দিতে চাই তার চম্পলতলে। বহুকাল ধরে শুনেছি, সিলেটের পাঠকবর্গ সকল বিস্ময়কে বুকে ধারণ করে। বিপুলাগ্রহ আমাকে মধ্যাকর্ষণের মতো টেনে নিল পীর আউলিয়াদের আত্মার লোকালয়ে। আমি অহংকারকে উড়িয়ে দিলাম বাতাসে। মাতাবনত করে ইয়েমেনের বক্ষমুছক তাজে ওলীর পায়ের সন্নিকটে অনুনয় করে বসলাম। খুলে যায় অতঃপর বেহেশতি কপাট। পুরো সিলেট বিমল প্রাণে হেসে উঠল দেখেছি। ইশকের পেয়ালা ঠোঁটে ধরে সেখানে সত্যিই আমি একবার মৃত্যুবরণ করলাম।
ধাবমান মানুষ যে যার মতো উড়ে যাচ্ছে এদেশ-ওদেশ ; বিস্ময় দেখবে বলে। আমি কতিপয় ক্ষুদে স্রষ্টাকে দেখতে সিলেট আসলাম। কেমুসাস মেলায় সম্ভাবনার বিচিত্র ঈর্ষা ও তাদের অজেয় রচনাসম্ভার আমার পায় বেড়ি পরালো। সেখানে অষ্টপ্রহর লোভাতুর তন্ময়তা আমাদের বিভাজন রেখা মুছে দিলো। এই অলৌকিক দান আমি কোলে কাঁখে নিয়ে ফেরি করতে চাই সমগ্র বাংলাদেশ।
শিল্পী হয়েছি বলে, শিল্পের জন্য যে মায়া উদ্বেলিত হয় চোখে—তা প্রিয়তমা কেড়ে নিতে পারে না। অর্থের অভাব, সাংসারিক অনটন, হৃদয়ের বার্ধক্য কোন কালেই শিল্পের প্রতি শিল্পীর অপার ভালবাসা হরণ করতে পারেনি। ধ্রুব সত্যের মতো সিলেটেও আমি এই মোহ টের পেয়েছি। প্রতিটি লোকালয়, পথ ও গলি, মানুষের আবাসস্থল, বাজারঘাট আর পর্যটন স্পটের নামাঙ্কন দেখে অনুভব করেছিলাম, পৃথিবীকে গদ্যময় করতে তারা কৃপণতা করেননি। উষর রাতের অনাবাদী মাঠে যারা চাষাবাদ করেছিলেন তাদের রুহু জগতে দুরুদের উপঢৌকন পাঠাতে চাই। সিলেট শিল্প সাহিত্যের জন্য আরও বিমূর্ত হয়ে উঠলে আমিই বরং খুশি হব বেশি। গমনের এই টান শূন্য পকেট চেপে ধরতে পারেনি। ছুটেছিলাম হকার এজেন্সির পেপার যানে চড়ে। আকিব ভাইয়ের সঙ্গে সফরে উদ্ভাবন করছিলাম একের পর এক আলাদ্দিনের চেরাগ।
কেমুসাস বইমেলা প্রাঙ্গনে ঢুকতেই আতিথ্য আমাদের বরণ করে নিল। চত্বর ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচনের আনন্দে একপ্রকার বিভোরই ছিলাম। হাবিব মওদুদ ও আযফার ভাই বাদাম-চা পরিবেশন করলেন ডেকে নিয়ে কালান্তরের স্টলে। সবার মুখেই সেখানের ঐতিহ্য-তিলক পরিলক্ষিত হচ্ছিলো—ঠোঁটে পানের লাল ফুল হাসির সঙ্গে শোভা ছড়ায়। ঐতিহ্যের স্টলে ভীষণ প্রিয় মানুষ অপেক্ষারত ছিলেন। সেখানের গানের সন্ধ্যায় ডুবে ফিরে গেলাম রুমির মজমায়। তুহিন ভাইয়ের কন্ঠে গানের বুলবুল প্রাণ ফিরে পেল। সকলেই কন্ঠ মিলালে মেলার যুবতীদের কৌতূহলী দৃষ্টি ‘যে তুমি হরণ করো’ বলে প্রলুব্ধ হচ্ছিলো। ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই মিলে সুর উঠায়। কেউ-বা ভিডিও ধারণ করতে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে গেল। আমি? আমি তো রীতিমত পণ জপেই বসেছিলাম, মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে সিলেটে থেকে যাবো একটি টঙঘর ভাড়া নিয়ে। লোভটা জাগার হেতু আসলে সংগীত-ভক্তি চরম ও মাত্রাতিরিক্ত হওয়া। মনে হয়, কখনো গানের সুর কানে কিংবা পরানে না বাজলে নিরানন্দে অকাল যবনিকা সত্যিই নেমে আসবে।
মুহাম্মাদ আব্দুল কাদির এলেন। চতুর উপহার দিলে আমি টাকার কানাকড়িও ঠেলেঠুলে গছিয়ে দিতে পারলাম না। তার সঙ্গে গেলাম বশির কমপ্লেক্স। বিহান সম্পাদককে না পেয়ে হতাশ হলাম, কথা ছিল কিছু। নসিবের দোষে জানতে হলো— গ্রামের ওয়াজ-মাহফিল পরিচালনা করতে সেদিন সকালেই সিলেট শহর ছেড়েছিলেন। চার সিঁড়ি টপকে কালান্তর প্রকাশনীর অফিসে গেলেই ভাঁজপত্রের লাবীব হুমাইদী ভাইয়ের সঙ্গে অকস্মাৎ মোলাকাত। অফিসের মূল রুমে ঢুকলে আবুল কালাম আজাদ সাহেব বড় আরামকেদারায় বসে আছেন। কথা হলো, প্রলয়শিখা দিলাম, আশ্চর্য হলেন, লেখা ও সম্পাদনার তারিফ করলেও ডিজাইনের প্রশংসা করলেন ভূয়সী। এতে আমি তৎক্ষনাৎ লজ্জা অনুভব করলাম। সে লজ্জিত ক্ষণ আমাকে তাড়িত করে বেড়ায় প্রতিনিয়তই। আমিও নিজের কাছে মুখচোরা হয়ে থাকি।
এই যাত্রার পাঠ চুকাতে সময় লেগেছে ভীষণ। নির্বাচিত বুকশপে মুহুর্মুহু হৃদয় কোলাজ করে উঠেছে। সাখাওয়াত হোসেন সাকিল ভাইয়ের রম্য গল্পের ঝাঁঝে অট্টহাসির বাষ্প ছড়িয়ে পড়া, সৈকত ভাইয়ের বই-বিপণনের ভূরি ভূরি ব্যস্ততার মাঝেও ঝালমুড়ি পার্টি, মোস্তাক ভাইয়ের অনুসন্ধানী মন, জয়নাল আবেদীন ভাইয়ের কবিতার তিলোত্তমা, তাকি ভাইয়ের তড়িৎ উপস্থিতি ও বুক ইনফ্লুয়েন্সার সৈকত ভাইয়ের দর্শনের কপচা হাতে নিয়ে জীবনের এই মুহূর্তগুলো হৃদয়ের লালিত প্রেমকে অলঙ্কৃত করেছে বলেই বারবার ফিরে যেতে উদ্গ্রীব হই। জিন্দাবাজার না পৌঁছলে সিলেটীদের সাহিত্যপ্রীতির রহস্য উদঘাটন করা কবর খুড়ে লাশ বের করার নামান্তর হয়ে যেত।
কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ যেমন সাহিত্য-মোদীদের রুহের স্পন্দন জায়গাতে খোরাক বিতরণ করে যাচ্ছে প্রায় শত বছর ধরে তেমনি ওলীর মদিনায় এর যথার্থ তোয়াজ প্রদর্শিত হতে দেখেছি। গৌরবের বিষয় তা। রাজনীতিবিদদের অনৈতিক হেজিমনির কবলে কেমুসাস কখনোই আক্রান্ত না হোক আমি চাই। অর্থলিপ্সু বধির নেতাদের হস্তক্ষেপে ইতিহাসের পাঠ-সিন্দুর বিলুপ্ত হয়েছে অনেক।
আমি যদি সিলেটের মানুষ হতাম এবং সেখানকার জীবনবোধে ও সাহিত্যে আমার শিকড় বিস্তৃত হতো— এই বৈরী সময়ে আমি নির্ঘাত একটি অঘটন বয়ে নিয়ে আসতাম বাংলা সাহিত্যের উপর। জগত বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে থাকলেও, বিভাজনের কথায় আমাকে বিচূর্ণ করা হলেও, আমাকে ক্লান্তির শিখরে পৌঁছে দিলেও আমি সেটা করতাম এবং সফল হতাম বলে আমার পূর্ণবিশ্বাস। সিলেটের নিজস্ব ভাষারীতি ও বর্ণনীতি মেনে একদল পাঠক ও লেখকদের নিয়ে চলতো এই প্রতিরোধ। পত্রিকা প্রকাশের সংগঠন তৈরি করতাম। প্রতিস্থাপনের জন্য চক্রের পর চক্র সাজিয়ে যেতাম, মানুষকে ফুঁসিয়ে দিতাম এই কাজে। তবুও ঢাকার শহুরে ‘কিছু’ মানুষের বোধদয় না হলে বাংলা সাহিত্যের উপর বিপর্যয় আসবেই। রাজনৈতিক আধিপত্যের মতো সাহিত্যে যারা আঞ্চলিক ক্ষোভকে চিরজাগ্রত করতে চায় তাদের জন্য আমার এই তোহফাটুকু হয়তো গরম তেলে বেগুন ঢালা হতো। ভাগ্য সহায়, খোদা তায়ালায় সিলেটে জন্ম-জীবন কোনটাই আমাকে দেন নাই ।
প্রমথ চৌধুরীর সুখ্যাতি দেখে যাদের লোভ সঞ্চার হয়েছে অন্তরে এবং সেই খ্যাতি লুফে নেওয়ার জন্য অগ্রসর হয়েছেন তারা বলছেন, প্রমথ সাহেব আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন প্রমিত বাংলাকে। অথচ তারা যে আঞ্চলিক কলহ বাঁধিয়ে দেবার বাঁকে ঘুরছেন এবং এক গোষ্ঠীর ভাষাকে পুরো বাংলা সাহিত্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন সে কথা বুঝার গর্জ নেই বলেই একাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে রথী-মহারথী সাজবার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই হীন চেষ্টাকে প্রতিস্থাপনের জন্য কেউ কেউ “জেন-জি ভাষা” বলে উত্থানের শক্তিকে অপব্যবহার করতে চাচ্ছেন।
এমন গর্বিত কাজের জন্য দীর্ঘদিন যারা মেহনতি ছিলেন তাদের মেহনত কবুল হোক, খোদার আরশে পড়ে দোয়া মাঙি। কলহটি বৃদ্ধি হোক। এতে আমার কীসের দায়? আমি যুগের তালে তালে নেচে গেয়ে অতিক্রান্ত হবো। অত লোভ কিংবা নতুন প্রমথ চৌধুরীর সুনাম কুড়াবার মনোকাঙ্ক্ষা নেই আমার। আমি সিলেটি হলে হয়তো এই বোধটুকু জন্মাতে পারতো। তবে এইটুকু চাওয়া তো থাকতেই পারে আমাদের উষর রাতের অনাবাদী মাঠে ফসল ফলালেন যারা তারা আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি থেকে যাক!
কেমুসাস মেলায় পরপর দুই/তিন দিন আড্ডা রসিকতায় কাটালেও মন কীসে বেঁধে গিয়েছিল ঠিক অনুমান করে আজও দিশা পাচ্ছি না। শেষ রাতের আড্ডায় বিদায় নিতে নিতে আমার আর আকিব ভাইয়ের হাত বইয়ে ভরে গেল । আকর্ষণীয় যে কেতাব আমার চোখে লেগে ছিল তা আকিব ভাই স্বল্প দামে হাজারের কম টাকায় খসিয়ে বগল বাজিয়েছিলেন আনন্দে । জওহরলাল নেহরুর ‘বিশ্ব প্রসঙ্গ’। সাদা ভাই (সাখাওয়াত হোসেন সাকিল) সিলেটি বইপোকা মহলের গুরু । এবং উদার হাতে সবাইকে বই গিফট করেন । ঈদ মৌসুমে সবাইকে যখন সকলের পছন্দের বই গিফট করেন তখন দূর ঢাকা শহর থেকে বিশেষত আমি মনে দুঃখ যাপন করি । সিলেটের নির্বাচিত বন্ধ হয়ে গেল এই কিছুদিন হয় । তিনি নাকি এ বুকশপের সব বই কিনে রেখে দিয়েছেন । আল্লাহ তাকে চির যৌবন দান করুন, যেভাবে আমাদের তিনি কেতাবাদি উপহার দিয়ে থাকেন । (এই প্যারাটা এসময় লেখা। এর পূর্বের প্যারাগুলো লিখেছি এক বা দেড় বছর আগে । তখনও নির্বাচিত সিলেট বন্ধ হয়নি। আমাদের আনন্দের রসায়ন এখানেই ঝালমরিচে বাঁটা হতো ।)
আমার পান খাওয়ার বাঙালি অভ্যাস নেই । কতবার প্রচেষ্টা করেছি, এই আয়েশের সঙ্গে মিলে যেতে । এক গাল ফুলিয়ে অথেনটিক পান চিবাবো-এর যে কি জাদুকরি স্বাদ দেখে অনুভব হয়, তা ফুরাতে পারি না । লজ্জায় বলতে নেই । জিভ কেটে বলছি, মিষ্টি পান খেয়ে এ কয়দিন সখ মিটাবার কোশেশ করতে কসুর করিনি।


০টি মন্তব্য